কলাম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি: নীতিনির্ধারণ বনাম প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সংকট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি: নীতিনির্ধারণ বনাম প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সংকট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক বিপ্লবের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ২০২৬-২০৩০ মেয়াদী জাতীয় এআই নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করেছে, যা দেশের প্রযুক্তিগত ভবিষ্যতের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মূলত বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে নিজস্ব ডেটাসেট ও কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও, এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কেবল চ্যাটজিপিটি বা এজাতীয় বিদেশি টুলস ব্যবহারের সক্ষমতাকে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং স্থানীয় প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই মডেল তৈরি এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত এই নীতিমালার খসড়াটি একটি দায়িত্বশীল ও উদ্ভাবনভিত্তিক ইকোসিস্টেম তৈরির প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা কতটা কার্যকর হবে তা নির্ভর করছে সরকারি বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার সদিচ্ছার ওপর।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট খাতের ভুক্তভোগী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এআই গবেষণার যে পরিধি থাকা প্রয়োজন, তা বর্তমানে অত্যন্ত নগণ্য। বাংলা ভাষার জন্য সমৃদ্ধ ডেটাসেট না থাকা এবং সরকারি নথিপত্র বা আইনগত তথ্য বিশ্লেষণে নিজস্ব প্রযুক্তির অভাব স্থানীয় পর্যায়ে এআই-এর সুফল প্রাপ্তিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের মতে, যদি বাংলাদেশ নিজস্ব ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও শক্তিশালী কম্পিউটিং ক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তবে এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশটি কেবল একটি বৈশ্বিক বাজারে পরিণত হবে, যেখানে বিদেশি সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য বজায় থাকবে। এছাড়া এআই-এর ভুল সিদ্ধান্তের দায়ভার কার ওপর বর্তাবে, তা নিয়ে স্পষ্ট আইনি কাঠামোর অনুপস্থিতি ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট তৈরি করছে, যা প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এই জটিল পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রযুক্তিবিদরা। নীতিমালার খসড়া তৈরিই শেষ কথা নয়, বরং দেশীয় স্টার্টআপগুলোকে এআই মডেল তৈরির সুযোগ দেওয়া এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারকদের ভাষ্যমতে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এআই ইকোসিস্টেম গড়ার কাজ চলছে, তবে এর জন্য কেবল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নয়, বরং ডেটা সায়েন্টিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট এবং ডোমেইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দক্ষ মানবসম্পদ বাহিনী গড়ে তোলা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রায়োগিক দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত না করলে এবং শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এই জাতীয় নীতিমালা শুধুমাত্র কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে মন্থর করে দিতে পারে।

পরিশেষে, ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য এআই সক্ষমতা প্রমাণের একটি কঠিন পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। বিশ্ব যখন এআই-এর পরবর্তী প্রজন্মের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ যদি কেবল প্রযুক্তি আমদানিকারক হিসেবেই টিকে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়বে। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং বাংলা ভাষার নিজস্ব ডেটাবেজ সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি আত্মনির্ভরশীল প্রযুক্তি কাঠামো গড়ে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রযুক্তির বাজারে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তি নির্মাতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি প্রবল, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।