দারিদ্র্যের কোপ আর ঝরে যাওয়া স্বপ্ন
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে এখনও লাখ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত, যার একটি বড় অংশ আবার কাজ করছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। হোটেল-রেস্তোরাঁ, ওয়েল্ডিং কারখানা, ইটভাটা থেকে শুরু করে বাস-লেগুনার হেল্পারি—সর্বত্রই যেন কম খরচে সস্তা শ্রম পাওয়ার সহজ হাতিয়ার এসব কোমলমতি শিশু। দারিদ্র্য, ভাঙা পরিবার, বাবা-মায়ের অসমর্থতা এবং শিক্ষা সচেতনতার অভাব শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে এই অন্ধকারের দিকে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, শৈশবের এই পঙ্গুত্ব কেবল একটি শিশুর জীবন ধ্বংস করছে না, বরং পুরো জাতির আগামীর ভবিষ্যৎকে বিকলাঙ্গ করে দিচ্ছে?
আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রয়েছে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা এবং শিশু সুরক্ষা আইনও। কিন্তু বাস্তবে এই আইন ও কাগজের নীতিগুলোর প্রয়োগ কতটুকু? অসাধু মালিকেরা সামান্য টাকা বাঁচানোর লোভে শিশুদের কম মজুরিতে দীর্ঘক্ষণ খাটিয়ে নিচ্ছে। তাদের নেই কোনো স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, আর নির্যাতনের শিকার হওয়া তো নিত্যদিনের চিত্র। পত্রিকার পাতা খুললেই প্রায়ই দেখা যায় কারখানায় বা বাসাবাড়িতে শিশু গৃহকর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতনের খবর।
কেবল আইন নয়, প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
শিশুশ্রম কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগ দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না আমরা মানসিকভাবে পরিবর্তন আনব, ততক্ষণ এই অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে না। নিজের সন্তানকে আমরা যেভাবে রঙিন স্বপ্নে গড়ে তোলার চেষ্টা করি, অন্যের সন্তান বা পথশিশুর প্রতিও আমাদের সেই সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি। দোকানে বা বাসাবাড়িতে ছোট শিশুদের দিয়ে ভারী কাজ করিয়ে নেওয়ার যে অসুস্থ চর্চা আমাদের সমাজে ছড়িয়ে আছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
উত্তরণের পথ কোন দিকে?
শিশুশ্রম নির্মূল করতে হলে প্রথমত, দুস্থ ও দরিদ্র পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল শিশুকে স্কুলগামী করলেই হবে না, সেই শিশুর পরিবার যেন পেটের টানে তাকে কাজে পাঠাতে বাধ্য না হয়—সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োজিত করা মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও অর্থদণ্ডের বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু প্রতিটি দেশের হাসিমুখ ও সম্ভাবনার প্রতীক। ফুল ফোটানোর আগেই তাকে যদি দলিত-মথিত করা হয়, তবে সুন্দর ভবিষ্যতের আশা করা বাতুলতা মাত্র। প্রতিটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ শৈশব, পুষ্টিকর খাবার এবং শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। শিশুশ্রম মুক্ত সমাজ গঠন কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।




