কলাম

AI-এর বিশ্বযুদ্ধ শুরু, বাংলাদেশ কি শুধু দর্শক?

AI-এর বিশ্বযুদ্ধ শুরু, বাংলাদেশ কি শুধু দর্শক?

বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা এখন কেবল সফটওয়্যার উন্নয়নের গণ্ডি ছাড়িয়ে সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাইবার সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন চিপ উৎপাদন, কম্পিউটিং পাওয়ার এবং ডেটা সেন্টার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলছে, তখন বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে যে, বৈশ্বিক এআই ইকোসিস্টেমে বাংলাদেশ কেবল একটি ভোক্তা হিসেবে টিকে থাকবে, নাকি নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলার পথে হাঁটবে। এই প্রতিযোগিতার মূল চালিকাশক্তি এখন ডেটা ও কম্পিউটিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার, যেখানে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর জন্য টিকে থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সামনে এখন প্রধান সংকট হলো, বিদেশি প্রযুক্তির ওপর অন্ধনির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব উদ্ভাবনী সক্ষমতা তৈরি করা, যা জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হতে পারে।

বাংলাদেশের শ্রমঘন অর্থনীতি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ ও সম্ভাবনা উভয়ই বিদ্যমান। অটোমেশনের প্রভাবে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় এআই বিপ্লব আনতে পারে। তবে ভুক্তভোগী শ্রমিক ও বিশ্লেষকদের মতে, সঠিক প্রশিক্ষণ ও রিস্কিলিং প্রোগ্রামের অভাব থাকলে এই প্রযুক্তি সামাজিক বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে এআই টিউটর বা পার্সোনালাইজড লার্নিং ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক নির্ভরতা তৈরির বিষয়টিও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এআই কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার, যা সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে স্থানীয় শ্রমবাজার ও শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জাতীয় এআই পলিসি ২০২৬-২০৩০ প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তিবিদদের মতে, কেবল নীতিমালা প্রণয়ন করলেই এআই ইকোসিস্টেম তৈরি হয় না; এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা গভর্ন্যান্স এবং স্টার্টআপ ফাইন্যান্সিংয়ের সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারি সেবা, কৃষি, স্বাস্থ্য ও আইন ব্যবস্থায় স্থানীয় এআই মডেল তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজস্ব প্রযুক্তির ভিত্তি গড়তে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় যে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করার পরিবর্তে বিদেশি এআই সাবস্ক্রিপশনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের প্রযুক্তি বাজারকে পরনির্ভরশীল করে তুলছে, যা জাতীয় স্বার্থের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

আগামী নভেম্বর মাসে লিসবনে অনুষ্ঠিতব্য ওয়েব সামিটের প্রাক্কালে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তি কেনা নাকি প্রযুক্তি তৈরির অংশীদার হওয়া—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী ও দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল অর্থনীতিকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ উদ্ভাবকের তালিকায় স্থান করে নিতে পারে, অন্যথায় কেবল ব্যবহারকারী হিসেবেই বৈশ্বিক বাজারে থেকে যেতে হবে। প্রযুক্তির আগামী দিনের ইতিহাসে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে হলে কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সঠিক বণ্টন ও টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই মুহূর্তে গৃহীত কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় গবেষণায় বিনিয়োগের ওপর, যা নির্ধারণ করবে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত মর্যাদা।