নিজস্ব প্রতিবেদক:
দুর্গম পাহাড়ি পথ, চিকিৎসাকেন্দ্রের সীমিত প্রাপ্যতা, পুষ্টির ঘাটতি, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি এবং বর্ষাকালে বন্যা-ভূমিধস—সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোই অনেক পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান ভৌগোলিকভাবে দেশের সমতল এলাকার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। দুর্গম পাহাড়, খাড়া পথ, নদী ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বসতির কারণে অনেক প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াত সময়সাপেক্ষ। শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমেও এ বাস্তবতার প্রভাব দেখা যায়। ইউনিসেফের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বান্দরবানের থানচি ও আশপাশের প্রত্যন্ত এলাকায় শিশুদের টিকা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নৌপথ ও পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।
এ ধরনের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা শুধু জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রেই নয়, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করে। জ্বর, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, অপুষ্টি কিংবা টিকাদানযোগ্য রোগের মতো সাধারণ সমস্যাও সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না পেলে জটিল আকার ধারণ করতে পারে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা প্রয়োজনীয় টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের শিশুদের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
পুষ্টিও পাহাড়ি নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং তারা সংক্রমণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। ইউনিসেফের জাতীয় পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৮ শতাংশ খর্বাকৃতির এবং ১০ শতাংশ ক্ষীণকায়; কঠিন ও দুর্গম এলাকাগুলোতে অপুষ্টি শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা পৌঁছে দিতে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে, যার আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামও রয়েছে।
নারীদের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যঝুঁকির ধরন আলাদা। প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ পাওয়ার সুযোগ অনেক সময় সীমিত থাকে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়ন নিয়ে ইউএনডিপির ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যানিটারি প্যাডের উচ্চমূল্য ও সচেতনতার সীমাবদ্ধতার কারণে মেয়েদের স্কুলে উপস্থিতি এবং নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতো। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিন পার্বত্য জেলায় ১১৮ জন প্রশিক্ষিত নারী প্রজননস্বাস্থ্যকর্মী ২৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন।
মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও পাহাড়ের দুর্গমতা বড় বিষয়। গর্ভবতী নারীর জরুরি অবস্থা তৈরি হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হতে পারে। পাহাড়ি সড়কের অবস্থা, দূরত্ব এবং বর্ষাকালে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে চিকিৎসা পেতে বিলম্বের ঝুঁকি থাকে। এ কারণে গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সেবাকে স্থানীয় পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা ইউনিসেফও উল্লেখ করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অবশ্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। রাঙামাটি সরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সেবা, প্রসূতি ও নবজাতকের যত্ন এবং প্রসবকেন্দ্রিক চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউনিসেফের একটি কেস স্টাডিতে হাসপাতালটিতে প্রসূতি ও নবজাতকদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা, প্রসবকক্ষ এবং অসুস্থ বা কম ওজনের নবজাতকের জন্য ইনকিউবেটরের সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাঙামাটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ২০২৬ সালের এপ্রিলে একটি আধুনিক সংক্রামক স্বাস্থ্যসেবা বর্জ্য শোধনাগার চালু করা হয়েছে। ইউএনডিপি জানিয়েছে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাসপাতালের চিকিৎসাবর্জ্য নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনা করা দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ ছিল। নতুন ব্যবস্থাটি রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও আশপাশের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখবে।
তবে বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের জেন্ডার অ্যালার্টে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় মৌসুমি বন্যা, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে নারী, কিশোরী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর আলাদা ধরনের প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এর আগের বন্যা পরিস্থিতির অভিজ্ঞতাও উদ্বেগের কারণ। ২০২৩ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে খাদ্য, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুবিধা ব্যাহত হয়েছিল। ইউনিসেফের হিসাবে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবান মিলিয়ে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; তাদের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল। ওই ঘটনায় স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়।
এ অবস্থায় পাহাড়ে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শুধু হাসপাতাল নির্মাণ নয়, দুর্গম বসতিতে পৌঁছাতে সক্ষম কমিউনিটি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করা জরুরি। প্রত্যন্ত এলাকায় প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, নিয়মিত টিকাদান, পুষ্টি পর্যবেক্ষণ, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে চিকিৎসা পেতে বিলম্বের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিভিন্ন উদ্যোগে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে মৌলিক সেবা পৌঁছে দিতে দীর্ঘদিন ধরে পাড়া কেন্দ্রভিত্তিক ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, পানি-স্যানিটেশন ও শিশুর সুরক্ষাসহ বিভিন্ন মৌলিক সেবা প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে ২০২৬ সালের সর্বশেষ ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, পাহাড়ি জনপদে স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। আলীকদমের কুরুকপাতায় হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সরকারের জরুরি নির্দেশনা, প্রত্যন্ত এলাকায় টিকাদান পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের কঠিন যাত্রা এবং নারী ও কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে চলমান কাজ—সবই একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবার সংকট কেবল রোগের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দূরত্ব, যোগাযোগ, দারিদ্র্য, পুষ্টি, সচেতনতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মিলিত প্রভাব।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পরিকল্পনায় তাই পাহাড়ের জন্য সমতলের সাধারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় মোবাইল মেডিকেল টিম, নিয়মিত টিকাদান ও পুষ্টি কার্যক্রম, প্রশিক্ষিত নারী স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারীর দ্রুত রেফারেল, জরুরি পরিবহন এবং বর্ষাকালীন বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে নারী ও শিশুদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে পাহাড়ের নারী-শিশুদের স্বাস্থ্যকে তাই বিচ্ছিন্ন কোনো চিকিৎসা সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুর্গম বসতিতে চিকিৎসা পৌঁছানো, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগের সময় স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখা—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে গুরুত্ব না পেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। চলতি বর্ষা মৌসুমে সেই সক্ষমতা কতটা কার্যকর থাকে, সেটিই এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী ও শিশুদের জন্য বড় পরীক্ষার বিষয়।