সারাদেশ

বগুড়ায় শ্রমিকদের ওপর বাস, নিহত ৭

বগুড়ায় শ্রমিকদের ওপর বাস, নিহত ৭

বগুড়া প্রতিনিধি:

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। কাজের সন্ধানে প্রতিদিনের মতো বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে জড়ো হয়েছিলেন দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকেরা। কেউ বগুড়া, কেউ নওগাঁ কিংবা আশপাশের এলাকায় ধান রোপণসহ বিভিন্ন কাজে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস তাঁদের ওপর উঠে গেলে মুহূর্তেই পাল্টে যায় পুরো দৃশ্য। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে এ দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ থেকে ১৮ জন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহত সাতজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাতে ঢাকা থেকে নওগাঁর উদ্দেশে ছেড়ে যায় শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস। সকালে বাসটি বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের এরুলিয়া এলাকার সিল্কিবান্ধায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। বাসটি সড়কের পাশে থাকা একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ধাক্কা দিয়ে কাজের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। বাসের চাপায় ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজন মারা যান।

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইব্রাহীম আলী জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি মোটরসাইকেল আরোহীকে বাঁচাতে গিয়ে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপর এটি একটি খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে বগুড়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা ও দিনাজপুরের বাসিন্দা রয়েছেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী নিহতরা হলেন বগুড়া সদর উপজেলার ফাপোঁড় মধ্যপাড়ার বেল্লাল হোসেন (৪০), কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদারপাড়ার নুর মোহাম্মদ সরদার (৭৫), জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার মো. আনারুল ইসলাম (৫৫), পাঁচবিবি উপজেলার আমিরুল (৪০), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আবু সাইদ (৪৫), একই উপজেলার নুর আলম (৪৫) এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মো. তাজিমুল (৪৭)।

অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে গাইবান্ধার কয়েকজন শ্রমিক ধান রোপণের কাজ করতে নওগাঁ ও বগুড়ার দিকে যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ ভোরে কাজের সন্ধানে বা কৃষিশ্রমিক হিসেবে কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া মানুষগুলোর জন্য মহাসড়কের পাশের এই অপেক্ষার স্থানই হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে সড়কের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক যানবাহন আটকা পড়ে এবং যানজটের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি ছিল, ওই এলাকায় শ্রমিকদের নিরাপদে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা এবং সড়কে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। পরে সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষ স্পিডব্রেকার নির্মাণের কাজ শুরু করলে স্থানীয়রা অবরোধ তুলে নেন। এরপর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের কয়েকজনের মাথা ও পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে। তাঁদের মধ্যে আইসিইউতে থাকা একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মনোয়ারুল কাদির বিটু। প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠানোর প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মনোয়ারুল কাদির বিটু। তিনি জানান, আহতদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও রক্তের ব্যবস্থা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করবে। গুরুতর আহতদের চিকিৎসায় প্রয়োজন হলে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহত প্রত্যেককে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিদিন কাজের সন্ধানে ভোরে মহাসড়কের পাশে জড়ো হওয়া শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে। বগুড়ার এরুলিয়ার এই শ্রমিক সমাগমস্থলে নিরাপদ অপেক্ষাস্থল, সড়ক বিভাজন, গতিনিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল—দুর্ঘটনার পর বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ ও ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রাণহানির এই ঘটনায় একদিকে সাতটি পরিবার হারিয়েছে তাদের কর্মক্ষম স্বজন, অন্যদিকে আহতদের চিকিৎসা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি মহাসড়কের পাশে কর্মসংস্থানের আশায় অপেক্ষমাণ শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ স্থান এবং যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।