সারাদেশ

সিলেট-বগুড়ায় সড়কে ঝরল ১৬ প্রাণ

সিলেট-বগুড়ায় সড়কে ঝরল ১৬ প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ছুটির দিনের সকাল। দেশের দুই প্রান্তে তখন কর্মচাঞ্চল্য শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোর থেকে সকাল—মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে বগুড়া ও সিলেটের দুটি মহাসড়ক পরিণত হয় মৃত্যুর মঞ্চে। বগুড়ায় কাজের সন্ধানে সড়কের পাশে জড়ো হওয়া শ্রমিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো বাস উঠে গেলে সাতজনের মৃত্যু হয়। আর সিলেটের ওসমানীনগরে দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান আরও নয়জন। পৃথক দুই দুর্ঘটনায় মোট ১৬ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

বগুড়ার সদর উপজেলার এরুলিয়ায় দুর্ঘটনাটি ঘটে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের এরুলিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে। প্রতিদিনের মতো বিভিন্ন এলাকা থেকে দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকেরা কাজের সন্ধানে সেখানে শ্রমিকের হাটে জড়ো হয়েছিলেন। রংপুর, গাইবান্ধা, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকেরা স্থানীয় গৃহস্থদের কাছ থেকে কাজ পাওয়ার আশায় ভোরেই সেখানে অবস্থান নেন। সেই অপেক্ষাই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে নওগাঁগামী ‘শাহ ফতেহ আলী পরিবহন’-এর একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস এরুলিয়া এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেল আরোহীকে বাঁচাতে গিয়ে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে একটি খুঁটিতে ধাক্কা দেয় এবং পরে শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে কয়েকজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহতদের দ্রুত বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনায় নিহত সাতজনের পরিচয়ও সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী নিশ্চিত হয়েছে। তারা হলেন বগুড়া সদর উপজেলার ফাপোঁড় মধ্যপাড়ার বেল্লাল হোসেন (৪০), কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদারপাড়ার নুর মোহাম্মদ সরদার (৭৫), জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার মো. আনারুল ইসলাম (৫৫), পাঁচবিবি উপজেলার আমিরুল (৪০), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আবু সাইদ (৪৫), একই উপজেলার নুর আলম (৪৫) এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মো. তাজিমুল (৪৭)।

এ ঘটনায় অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন আহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। আহতদের বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের মাথা ও পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে এবং অন্তত একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ঘটনাস্থলে গতিরোধক নির্মাণের কাজ শুরু করলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনায় বগুড়া জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারের প্রত্যেককে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতদের চিকিৎসার বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, একই সকালে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর এলাকায় ঘটে আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ‘বেঙ্গল পরিবহন’ ও ‘ইউনিক পরিবহন’-এর দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই আটজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজনের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় নয়জনে।

সিলেটের দুর্ঘটনায় নিহত সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিহতদের মধ্যে কিশোরগঞ্জ, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার বাসিন্দাদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে হাজি সাইফুল ইসলাম (৫০), তিন বছর বয়সী শিশু জাইফা, সপ্তম রায় প্রীতম (২২), বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী (১৭), আবুল হোসেন (৪৪), আরমান (১৯), সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), সাইফুল ইসলাম ইমন এবং রুবেল সূত্রধর (৩৭) রয়েছেন।

দুর্ঘটনায় দুই বাসের অন্তত ২৪ থেকে ৩০ জন যাত্রী আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আহতদের সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর ১৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে কান, নাক ও গলা, চক্ষু এবং নিউরোসার্জারি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল এবং আরও দুজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়।

দুটি দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। বগুড়ায় প্রাথমিকভাবে বাসটির নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা বলা হলেও ঠিক কী কারণে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান, তা তদন্তে নির্ধারণ করা হবে। সিলেটেও দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান চলছে। সিলেটের ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।

একই সকালে দেশের দুই মহাসড়কে পরপর এই প্রাণহানি আবারও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে। বগুড়ায় কাজের আশায় মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ অপেক্ষাস্থল না থাকা এবং একটি নিয়ন্ত্রণহীন বাসের মুহূর্তের আঘাত সাতটি পরিবারকে শোকের সাগরে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে সিলেটে দুই বাসের সংঘর্ষ কেড়ে নিয়েছে আরও নয়টি প্রাণ। দুর্ঘটনার কারণ তদন্তের পাশাপাশি মহাসড়কে পথচারী, শ্রমিক ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।