সারাদেশ

পিরোজপুরে পেয়ারা মৌসুমে খালপথে কৃষকের ব্যস্ততা

পিরোজপুরে পেয়ারা মৌসুমে খালপথে কৃষকের ব্যস্ততা

পিরোজপুর প্রতিনিধি:

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা ও ভিমরুলি এলাকায় পেয়ারা মৌসুম ঘিরে খালগুলো এখন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ব্যস্ত জলপথে পরিণত হয়েছে। বাগান থেকে পাড়া পেয়ারা ছোট ছোট নৌকায় করে খালপথে ভাসমান বাজারে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নৌকায় পণ্য পরিবহনের এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থা বর্ষাকালে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

নেছারাবাদের কুড়িয়ানা, আটঘর ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পেয়ারা চাষ হয়ে আসছে। বর্ষা মৌসুমে গাছ থেকে পেয়ারা সংগ্রহ শুরু হলে সড়কপথের পাশাপাশি খালই হয়ে ওঠে কৃষকদের অন্যতম প্রধান পরিবহন ব্যবস্থা। সরু খাল দিয়ে নৌকা নিয়ে সরাসরি বাগানের কাছে পৌঁছে কৃষকেরা পেয়ারা বোঝাই করেন। পরে সেই নৌকা নিয়ে ভাসমান বাজারে গিয়ে পাইকার ও ব্যবসায়ীদের কাছে ফল বিক্রি করেন।

স্থানীয় কৃষি ও পর্যটনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, নেছারাবাদের পেয়ারা বাজারের সঙ্গে ভিমরুলি ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জলপথের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। কীর্তিপাশা খালকেন্দ্রিক ভাসমান বাজারে কৃষক ও পাইকারদের নৌকা একত্রিত হয়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পেয়ারা মৌসুমে এই জলপথে বেচাকেনার ব্যস্ততা বাড়ে এবং আগস্টে তা বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়।

শুধু কৃষিপণ্য পরিবহন নয়, এই জলপথ এখন গ্রামীণ পর্যটনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পেয়ারা বাগানের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু খাল, দুই পাড়ের সবুজ বাগান, নৌকায় ফল পরিবহন এবং পানির ওপর ভাসমান বাজার পর্যটকদের আকর্ষণ করে। আটঘর-কুড়িয়ানা ইউনিয়নের সরকারি পর্যটন তথ্যেও কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান ও কুড়িয়ানা পেয়ারা বাজারকে পর্যটন স্পট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পিরোজপুরের এই জলনির্ভর কৃষি অর্থনীতি শুধু একটি মৌসুমি ফলের বাজার নয়, বরং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কুড়িয়ানা, আটঘর ও ভিমরুলি এলাকাকে দেশের উল্লেখযোগ্য পেয়ারা উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রায় দুই শতাব্দীর কৃষি ঐতিহ্যের কথাও উঠে এসেছে।

বর্ষায় যখন খালগুলো পানিতে পূর্ণ থাকে, তখন নৌকায় পেয়ারা পরিবহন কৃষকের জন্য তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক ও কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করে। বাগান থেকে বাজার পর্যন্ত ফল পৌঁছানোর এই পদ্ধতিতে জলপথ একই সঙ্গে কৃষকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও এলাকার পর্যটন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।

তবে পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলপথ ও পেয়ারা বাগানের পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খাল ও বাগানে প্লাস্টিক, পলিথিনসহ অপচনশীল বর্জ্য না ফেলা, নৌযাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের স্বাভাবিক উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পর্যটনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

এভাবেই পিরোজপুরের পেয়ারা মৌসুমে খালপথ একদিকে কৃষকের ফল পরিবহনের ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি, প্রকৃতি ও পর্যটনের অনন্য সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় কৃষি ও জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা গেলে এই ভাসমান পর্যটন পথ ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ও টেকসই পর্যটন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।