সারাদেশ

পাখি, চুরি ও জলাবদ্ধতায় আগাম আমড়া তুলছেন চাষিরা

পাখি, চুরি ও জলাবদ্ধতায় আগাম আমড়া তুলছেন চাষিরা

পিরোজপুর প্রতিনিধি:

পিরোজপুরের আমড়া চাষিরা এবার নানা ঝুঁকির কারণে স্বাভাবিক সময়ের আগেই গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চাষিরা। পাখির আক্রমণে ফল নষ্ট হওয়া, বাগান থেকে আমড়া চুরি এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় পরিপক্ব হওয়ার আগেই আমড়া তুলে বাজারজাত করছেন তারা। এতে উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থাপনার পাশাপাশি চাষিদের কাঙ্ক্ষিত আয় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

পিরোজপুরের নেছারাবাদ, কাউখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে আমড়া চাষ হয়ে আসছে। জেলার মাটি ও আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় প্রতিবছরই বহু কৃষক আমড়ার বাগানের ওপর নির্ভর করে আয় করেন। জেলা প্রশাসনের তথ্যেও আমড়াকে পিরোজপুরের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে ৫৭৭ হেক্টর জমিতে আমড়ার আবাদ হয় এবং উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার ১২৪ মেট্রিক টন। উৎপাদনের দিক থেকে এটি বরিশাল বিভাগের শীর্ষ জেলা। আমড়ার বাজারমূল্যও প্রায় শতকোটি টাকা বলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

স্থানীয় চাষিদের ভাষ্য, আমড়া পরিপক্ব হওয়ার সময় বাগানে পাখির আনাগোনা বেড়ে যায়। পাখির ঠোকরে অনেক ফল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বাগান পাহারা দেওয়া কঠিন হওয়ায় রাতের বেলায় ফল চুরির আশঙ্কাও থাকে। এ কারণে গাছের ফল পুরোপুরি পরিপক্ব হওয়ার অপেক্ষা না করে অনেক চাষি আগেভাগে আমড়া পেড়ে ফেলছেন। তবে এ ধরনের আগাম সংগ্রহে ফলের আকার, স্বাদ ও বাজারমূল্যে প্রভাব পড়তে পারে।

বর্ষাকালে জলাবদ্ধতাও আমড়া চাষিদের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ। পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টি ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যায় কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়েও দেখা গেছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে আমন ধানের বীজতলা নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কৃষকদের অভিযোগ ছিল, পানি নিষ্কাশনের পথ ও চ্যানেল বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না।

আমড়া চাষের সঙ্গে জলাবদ্ধতার ঝুঁকির বিষয়টি নতুন নয়। আগের বিভিন্ন কৃষি প্রতিবেদনে পিরোজপুরের নিম্নাঞ্চলে অতিবৃষ্টির পর কয়েক দিন গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকলে আমড়া গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত ও গাছ মরে যাওয়ার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। ফলে বর্ষাকালে দ্রুত পানি নিষ্কাশন চাষিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চাষিরা জানান, আমড়া সাধারণত আষাঢ় থেকে আশ্বিন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সংগ্রহ করে বাজারজাত করা হয়। পরিপক্ব আমড়া শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে বেশি পাওয়া যায়। পিরোজপুরের বিভিন্ন হাট ও আড়ত থেকে এসব আমড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।

নেছারাবাদ ও কাউখালী এলাকায় আমড়া চাষের সঙ্গে স্থানীয় কৃষক, বেপারি, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিকসহ বহু মানুষ সরাসরি যুক্ত। ফলে ফলন ও বাজারজাতকরণে সমস্যা হলে এর প্রভাব শুধু বাগান মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে পিরোজপুর ও ঝালকাঠির আমড়া বাণিজ্যের সঙ্গে স্থানীয় বাজার, নৌপথ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ ব্যবস্থার বিস্তৃত সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমড়া চাষিদের আধুনিক ও পরিকল্পিতভাবে বাগান ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বর্তমান ওয়েবসাইটেও আমড়া-সংক্রান্ত কার্যক্রমের উল্লেখ রয়েছে।

চাষিদের দাবি, পাখির ক্ষতি ও চুরি ঠেকাতে স্থানীয়ভাবে কার্যকর নজরদারি, বাগানের নিরাপত্তা এবং বর্ষায় দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে আগাম ফল সংগ্রহের চাপ কমবে। একই সঙ্গে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সুবিধা বাড়ানো গেলে আমড়ার ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগও বাড়তে পারে। পিরোজপুরের আমড়া ইতোমধ্যে দেশের বাজারে পরিচিত একটি কৃষিপণ্য হওয়ায় উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।