সারাদেশ

হাওর-জলাভূমিতে নতুন মাছ সংরক্ষণাগার

হাওর-জলাভূমিতে নতুন মাছ সংরক্ষণাগার

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের হাওর ও জলাভূমিতে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ও বিস্তার বাড়াতে নতুন মৎস্য সংরক্ষণাগার ও অভয়াশ্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় মাছের প্রজাতি ফিরিয়ে আনা, জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের হাওর, বিল, নদী ও অন্যান্য মুক্ত জলাশয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কিন্তু জলাশয়ের নাব্যতা কমে যাওয়া, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, দূষণ এবং প্রজনন মৌসুমে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণের কারণে অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক জলাশয়ের নির্দিষ্ট অংশ সংরক্ষণের মাধ্যমে মাছের বংশবৃদ্ধির পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু গত ৯ মে নাটোরের গুরুদাসপুরে এক মৎস্য চাষি সম্মেলনে জানান, চলনবিলের হারানো ঐতিহ্য ও দেশীয় প্রজাতির মাছ ফিরিয়ে আনতে ওই অঞ্চলে আধুনিক মৎস্য সংরক্ষণাগার ও কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। মুক্ত জলাশয়ের মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষেত্রে রপ্তানির ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।

হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্যেও প্রাকৃতিক মাছ সংরক্ষণ ও জলাভূমির নাব্যতা বৃদ্ধিকে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিপুলসংখ্যক হাওর, নদী, খাল ও বিলকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বাইক্কা বিলের মতো জলাভূমিতে মাছ সংরক্ষণের অভিজ্ঞতাকেও এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এদিকে হাওর ও জলাভূমি সুরক্ষায় ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। এতে হাওর ও জলাভূমির পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো এলাকাকে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা, জলাভূমি ভরাট বা অবৈধ দখল, দূষণ এবং নিষিদ্ধ জাল, বৈদ্যুতিক শক বা বিষ প্রয়োগ করে মাছ আহরণের মতো কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পরিকল্পিত মাছ সংরক্ষণাগার গড়ে উঠলে শুধু মাছের উৎপাদন বাড়বে না, জলাভূমির প্রতিবেশ ব্যবস্থাও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। মাছের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার জন্য নিরাপদ জলাশয় তৈরি হলে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাকৃতিক মজুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে জলাভূমিনির্ভর জেলে ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকাও দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সংরক্ষণাগার বা মৎস্য অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি। কারণ শুধু কোনো জলাশয়কে সংরক্ষিত ঘোষণা করলেই মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য নিশ্চিত হয় না। পানির প্রবাহ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণ বন্ধ রাখা এবং অবৈধ শিকার প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলোও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওর ও জলাভূমিকে শুধু মাছ আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেশ ব্যবস্থা হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। পরিকল্পিত মৎস্য সংরক্ষণাগার, অভয়াশ্রম, জলাভূমির নাব্যতা রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা এবং জলাভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।