বরগুনা প্রতিনিধি:
বরগুনার আমতলীতে পায়রা নদীর তীর থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া মরদেহটি জাবেদ ইমন নামে এক স্কুলছাত্রের বলে শনাক্ত করেছেন তাঁর বাবা। নিহত জাবেদ ইমন আমতলী এ কে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে রোববার (৯ আগস্ট) আমতলী-কুয়াকাটা মহাসড়কের এ কে স্কুল পয়েন্টে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে ইমনের সহপাঠীসহ বিদ্যালয়ের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
জানা গেছে, উপজেলার মধ্য আড়পাঙ্গাশিয়া গ্রামের আউয়াল প্যাদার ছোট ছেলে জাবেদ ইমন আমতলী এ কে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। গত ২৬ জুলাই বিকেলে ইমন আড়পাঙ্গাশিয়া বাজারে যান। ওই বাজারের ব্যবসায়ী ইমরান তালুকদার (হৃদয়) তাঁকে ডেকে নিজের দোকানে নিয়ে যান। সেখানে ইমনের বন্ধু সাজিদকে রেখে ইমরান স্কুলছাত্র ইমনকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
ওইদিন রাত ৯টার দিকে পরিবারের লোকজন ইমনের খোঁজাখুঁজি করলে ইমরান তালুকদারের সঙ্গে তিনি আছেন বলে জানানো হয়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে ইমনের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি বলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানান। ওইদিন রাতে ইমরান তালুকদার ইমনের বাড়িতে গিয়ে তাঁর মা ফাতেমা বেগমের কাছে ইমনের কাছে তিন হাজার টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করেন।
পরদিন ২৭ জুলাই আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের বহিষ্কৃত ছাত্রদল সদস্যসচিব ও মাদক বিক্রেতা হিসেবে অভিযোগে উল্লেখ করা সগির বিশ্বাস ইমনের বাবার কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন এবং ইমন বালিয়াতলীতে আছেন বলে জানান। ইমনের বাবার অভিযোগ, সগির তিন দিন বিভিন্নভাবে তাঁদের পরিবারকে হয়রানি করেছেন।
এ ঘটনায় ইমনের বাবা আউয়াল প্যাদা ২৮ জুলাই আমতলী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরদিন ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় মধ্য আড়পাঙ্গাশিয়া পায়রা নদীর পাড় থেকে বস্তাবন্দি একটি মরদেহ উদ্ধার করে আমতলী থানা পুলিশ। মরদেহটি পচে যাওয়ায় তখন পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করতে পারেননি।
৩০ জুলাই পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ওই দিন ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ হিসেবে মরদেহটি বরগুনায় দাফন করা হয়। পরদিন ৩১ জুলাই আমতলী থানা পুলিশ নিহত স্কুলছাত্রের বাবা আউয়াল প্যাদাকে থানায় ডেকে নেয়। সেখানে তাঁকে বস্তাবন্দি মরদেহের পরিহিত পোশাক দেখানো হলে তিনি সেটি তাঁর ছেলে জাবেদ ইমনের মরদেহ বলে শনাক্ত করেন।
স্কুলছাত্র ইমনের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে তালতলী নিদ্রা সকিনা নৌ-পুলিশের পরিদর্শক সাগর ভদ্রকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ইমনের মরদেহ শনাক্ত হওয়ার পর সগির বিশ্বাস ও ব্যবসায়ী ইমরান তালুকদার এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে রোববার বেলা ১১টার দিকে আমতলী-কুয়াকাটা সড়কের এ কে স্কুল এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। এতে ইমনের সহপাঠীসহ বিদ্যালয়ের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জাবেদ ইমন একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তাঁকে হত্যা করে বস্তাবন্দি করে পায়রা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা।
নিহতের বাবা আউয়াল প্যাদা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাঁদের কঠোর শাস্তি চান তিনি। তাঁর অভিযোগ, ইমরান তালুকদার তাঁর ছেলেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ইমন নিখোঁজ হন। সগির বিশ্বাস নামের একজন ইমনের সন্ধান দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন, কিন্তু ছেলের সঠিক সন্ধান দেননি। বরং তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে নানাভাবে হয়রানি করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তালতলী নিদ্রা সকিনা নৌ-পুলিশের পরিদর্শক সাগর ভদ্র বলেন, স্কুলছাত্র ইমনের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ ইয়াকুব হোসাইন বলেন, স্কুলছাত্র ইমনের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে তালতলী নৌ-পুলিশের পরিদর্শককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ইমনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং এটি হত্যাকাণ্ড কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। এ প্রতিবেদন নিহতের পরিবারের অভিযোগ, প্রত্যক্ষ বক্তব্য ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।