নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনায় নওগাঁ ও নাটোরের গ্রামগুলোতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের ১৩ জন নওগাঁর এবং দুজন নাটোরের বাসিন্দা। বাকি একজনের বাড়ি রাজশাহীতে। গত রোববার দুপুরের ওই আগুনে একই সঙ্গে এতগুলো পরিবারের উপার্জনক্ষম স্বজন হারানোর ঘটনায় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের বাতাস।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল পর্যন্ত রিয়াদের ওই কারখানার অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার উজানপই গ্রামের ফরিদ, ডুবাই গ্রামের শুভ ও সুমন, গন্ডগোহালী গ্রামের মো. রুবেল প্রামাণিক, মো. কলিমউদ্দিন, মো. মোহন, মো. সুমন ও মিনহাজ, বোয়ালা গ্রামের হৃদয়, নওগাঁ সদর এলাকার শাহিন, খরস্রোতা গ্রামের আব্দুল জলিল ও মজিদুল এবং সাদনগর গ্রামের সাগর রয়েছেন। মিনহাজের গ্রামের নাম এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের শামিম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্যামলও নিহত হয়েছেন।
নওগাঁর আত্রাইয়ে একই উপজেলার একাধিক গ্রামের মানুষের এমন মৃত্যু স্থানীয়দের কাছে ঘটনাটিকে আরও মর্মস্পর্শী করে তুলেছে। যে ঘরগুলোতে একসময় প্রবাসী স্বজনের পাঠানো অর্থে সংসারের চাকা ঘুরত, সেসব ঘরেই এখন অপেক্ষা আর কান্নার ভার। প্রবাসে থাকা একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির জীবন থামিয়ে দেয় না; তার সঙ্গে থেমে যায় একটি পরিবারের আয়, সন্তানের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং বৃদ্ধ মা-বাবার শেষ আশ্রয়ের স্বপ্ন।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, রোববার বাংলাদেশ সময় আনুমানিক দুপুর ২টার দিকে রিয়াদের মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় সোফা তৈরির কারখানাটিতে আগুন লাগে। আগুনে ঘটনাস্থলেই ১৬ বাংলাদেশি নিহত হন। নিহত সবাই বাংলাদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে এবং কারখানাটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কী অবস্থায় ছিল, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত তদন্তের তথ্য প্রকাশ হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে অনুমান না করে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার দাবি।
এই জায়গাতেই উঠে আসে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন। সৌদি আরব বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোর একটি। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ডসংখ্যক ৭ লাখের বেশি কর্মী সৌদি আরবে গেছেন এবং দেশটিতে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়। তাঁদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের বহু পরিবারের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
অর্থাৎ রিয়াদের একটি কারখানার আগুনের ধোঁয়া শুধু সৌদি আরবের আকাশেই মিলিয়ে যায়নি; তার ছায়া পড়েছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের উঠোনেও। প্রবাসী শ্রমিকদের ঘামে যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তি পায়, তেমনি তাঁদের কর্মস্থলের নিরাপত্তার ঘাটতি হলে তার সবচেয়ে বড় আঘাত এসে পড়ে পরিবারের ওপর। বিদেশে কর্মসংস্থানকে শুধু আয় ও রেমিট্যান্সের হিসাব দিয়ে দেখলে এই মানবিক বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়।
সৌদি আরবে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে নিয়ম-কানুনও রয়েছে। ২০২৬ সালে দেশটির কর্তৃপক্ষ উচ্চঝুঁকির পেশায় কাজের জন্য নতুন নিরাপত্তা বিধিমালা অনুমোদন করেছে। একই সময়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি এবং কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সম্পর্কেও বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা হালনাগাদ করা হয়েছে।
তাই রিয়াদের এই অগ্নিকাণ্ডে শুধু কতজন মারা গেলেন, সেই হিসাবেই তদন্ত শেষ হওয়ার সুযোগ নেই। কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না, জরুরি বহির্গমন পথ যথাযথ ছিল কি না, শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল কি না, দুর্ঘটনার সময় উদ্ধারব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল এবং কর্মীদের অধিকার ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা, নাকি প্রতিরোধযোগ্য কোনো নিরাপত্তা ব্যর্থতার ফল।
বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং মরদেহ দেশে ফেরানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার কথা জানিয়েছে। নিহতদের পরিবার যাতে মরদেহ দ্রুত পায় এবং আইন অনুযায়ী প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
নওগাঁ ও নাটোরের যে পরিবারগুলো আজ স্বজন হারানোর শোকে স্তব্ধ, তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা কেবল আর্থিক অনুদানের বিষয় নয়; এটি একটি ন্যায়সংগত অধিকার। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থানের নথি যাচাই, বিমা বা ক্ষতিপূরণ থাকলে তা আদায়, নিয়োগকর্তার দায় নিরূপণ এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রবাসী হওয়ার অর্থ পরিবারের কাছ থেকে দূরে গিয়ে শুধু অর্থ উপার্জন করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকারও। রিয়াদের আগুনে ১৬টি জীবন নিভে যাওয়ার পর নওগাঁ-নাটোরের গ্রামগুলো যেন সেই সত্যই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের মানুষের সংখ্যা যত বাড়ছে, তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার কূটনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও তত বাড়ছে। শোকের এই আগুন যেন শুধু কয়েকটি পরিবারের চোখের জল হয়ে না থাকে; এর ছাই থেকে প্রবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে উঠুক—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।