আইন ও আদালত

ওসমানী বিমানবন্দর সম্প্রসারণে ২১২ কোটি টাকার মামলা, কাজের অগ্রগতি কম

ওসমানী বিমানবন্দর সম্প্রসারণে ২১২ কোটি টাকার মামলা, কাজের অগ্রগতি কম

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট

সিলেট এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে কাজের অগ্রগতির তুলনায় বড় অঙ্কের অগ্রিম বিল পরিশোধের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় ২ হাজার ১১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও অগ্রগতি ছিল খুবই কম। এরই মধ্যে কাজ না করে অগ্রিম বিল হিসেবে ২১২ কোটি টাকা ছাড়ের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে।

দুদকের মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে কাজের বিপরীতে অগ্রিম হিসেবে ২১২ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মুহিবুল হক, মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব জনেন্দ্রনাথ সরকার, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান এবং বেবিচকের কয়েকজন প্রকৌশলীসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

দুদকের এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, প্রকল্পের কাজে অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে স্থানীয় এজেন্ট ও কো-কন্ট্রাক্টর হিসেবে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। সংস্থাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে আইন ও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে প্রকল্পের অর্থ ছাড় এবং কাজ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।

প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, নতুন টার্মিনাল নির্মাণ এবং দেশি-বিদেশি বিমান চলাচলের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট এবং ২০২৩ সালের ২৭ মে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়। অন্য একটি স্থানীয় প্রতিবেদনে অগ্রগতি ২২ শতাংশের কিছু বেশি বলা হয়েছিল।

প্রকল্পের ধীরগতির কারণে সিলেটের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি হচ্ছে ওসমানী বিমানবন্দর থেকে আরও বেশি আন্তর্জাতিক রুটে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা। প্রকল্পটি দ্রুত ও মানসম্মতভাবে শেষ না হলে আধুনিক বিমানবন্দর সুবিধা পাওয়ার সেই প্রত্যাশা পূরণে বিলম্ব হতে পারে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রকল্পের ধীরগতির পাশাপাশি নকশা, নির্মাণসামগ্রী এবং অগ্রিম অর্থ পরিশোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, প্রকল্প শুরুর আগেই ইকুইপমেন্ট মোবিলাইজেশন বাবদ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেইজিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপকে ২১২ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল সীমিত। এসব অভিযোগ পরবর্তী সময়ে দুদকের মামলার অভিযোগের সঙ্গেও আলোচনায় আসে।

তবে প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন ও কাজের ধীরগতির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মইদুর রহমান মো. মওদুদ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে তৈরি নকশা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা এবং বাংলাদেশ জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালার হালনাগাদ নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে পরিবর্তন করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়েই নকশা হালনাগাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং কাউকে বাড়তি সুবিধা দিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো কাজ করা হয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন।

ওসমানী বিমানবন্দর প্রকল্পের এই মামলা বিমানবন্দর উন্নয়ন খাতে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। একটি প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি যদি প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকে, অথচ বিপুল অঙ্কের অগ্রিম অর্থ ছাড় হয়, তাহলে সেই অর্থের ব্যবহার, জামানত, বিল অনুমোদন, কাজের পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদারকি—সবকিছুই যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ে। একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী কাজ করেছে কি না, অর্থের বিপরীতে কী পরিমাণ কাজ হয়েছে এবং অগ্রিম অর্থের হিসাব কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দুদকের মামলার পাশাপাশি প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয় নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে যে প্রশ্নগুলো এসেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এখন গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থের ক্ষতি নিরূপণ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। আবার কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়মুক্তির বিষয়টিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

ওসমানী বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণের কাজ নয়; এর সঙ্গে সিলেটের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, প্রবাসীদের যাতায়াত, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং বিমান পরিবহন সক্ষমতা জড়িত। ফলে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও কাজের অগ্রগতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জনস্বার্থের বিষয়।

দুদকের মামলা তাই এখন শুধু ২১২ কোটি টাকার অগ্রিম বিলের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা, অর্থ ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি প্রক্রিয়া এবং সরকারি কর্মকর্তাদের তদারকির প্রশ্ন। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পটি কীভাবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে শেষ করা যায়, সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।