সারাদেশ

ময়মনসিংহে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ—তদন্তে দুদক

ময়মনসিংহে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ—তদন্তে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহে স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। সড়ক উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ ও জেলা পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কি না, কাজের বাস্তব অগ্রগতি এবং সরকারি বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আলাদাভাবে অনুসন্ধান ও অভিযান চালিয়েছে।

২০২৬ সালের ৩ মার্চ ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায় এলজিইডির একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ময়মনসিংহের একটি এনফোর্সমেন্ট দল অভিযান পরিচালনা করে। অভিযোগ ছিল, সড়ক উন্নয়নের নামে বরাদ্দ করা সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি। অভিযানের মাধ্যমে প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা, সংশ্লিষ্ট নথি এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রাজস্ব বাজেটের জনস্বাস্থ্য উপখাতের ৪৭টি প্রকল্পে মোট ৮৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে দুদক অভিযান চালায়। ওই সময় দুদকের কর্মকর্তারা জেলা পরিষদ কার্যালয়ে গিয়ে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করেন।

স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের গুরুত্ব এখানেই যে, এসব প্রকল্প সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্থানীয় অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। সড়ক নির্মাণ বা সংস্কার, সেতু, জনস্বাস্থ্য কিংবা স্থানীয় উন্নয়নকাজে বরাদ্দ করা অর্থের অপব্যবহার হলে একদিকে সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়, অন্যদিকে নির্ধারিত সেবা ও অবকাঠামো থেকে জনগণ বঞ্চিত হন।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম বলতে শুধু অর্থ আত্মসাত নয়; বরাদ্দের সঙ্গে বাস্তব কাজের অসামঞ্জস্য, কাজের মান কমে যাওয়া, অনুমোদিত নকশা বা পরিমাণের বাইরে কাজ দেখানো, কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ কিংবা প্রকল্পের উদ্দেশ্য অনুযায়ী অর্থ ব্যয় না করার মতো বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। তবে কোনো প্রকল্পে এসব অনিয়ম ঘটেছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও মাঠপর্যায়ের যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

ময়মনসিংহে জেলা পরিষদের প্রকল্প নিয়ে আগের তদন্তও স্থানীয় উন্নয়ন ব্যয়ে নথিভিত্তিক জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। ৪৭টি প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে অভিযোগের পর দুদক সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ করেছিল। এ ধরনের তদন্তে বরাদ্দের অনুমোদন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি, কাজের পরিমাণ, ঠিকাদারি বা বাস্তবায়ন পদ্ধতি, বিল-ভাউচার এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে হালুয়াঘাটে এলজিইডির সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে দুদকের অভিযান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল খাতের প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপরও নজরদারির প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে। এলজিইডি দেশের গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের সরকারি অর্থ ব্যয় করে। ফলে একটি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের দায় নয়, প্রকল্প অনুমোদন থেকে কাজের মান যাচাই ও বিল পরিশোধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সরকারি নথিতেও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন এবং ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদের পরিদর্শন প্রতিবেদনের ওপর ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য রয়েছে। এতে বোঝা যায়, স্থানীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকি ও পরিদর্শন প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ। কিন্তু অভিযোগের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের তদারকি কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও প্রয়োজনে পর্যালোচনা করা দরকার।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এ সরকারি সেবা ও বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির যে বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে, তার আলোকে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সরকারি অর্থের অপব্যবহার শুধু রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষতি করে না; প্রকল্পের সুফল কমিয়ে স্থানীয় জনগণের প্রতি রাষ্ট্রীয় সেবার কার্যকারিতাও দুর্বল করে।

তবে দুদকের অভিযান বা তদন্তকে কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, প্রকল্পের নথি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করাই আইনসম্মত পদ্ধতি।

ময়মনসিংহে স্থানীয় সরকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তাই এখন শুধু কয়েকটি প্রকল্পের হিসাবের বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রকল্পের মান, স্থানীয় মানুষের প্রাপ্য সুবিধা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন জড়িত। দুদকের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ঠেকাতে প্রকল্পের ব্যয় ও অগ্রগতি প্রকাশ, নিয়মিত সরেজমিন পরিদর্শন, কাজের মান যাচাই, বিল পরিশোধের আগে স্বাধীন যাচাই এবং স্থানীয় জনগণের অভিযোগ জানানোর সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এতে সরকারি অর্থের অপচয় কমার পাশাপাশি প্রকল্পের সুফল প্রকৃত জনগণের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও বাড়বে।