সারাদেশ

ময়মনসিংহসহ খাদ্য কর্মকর্তাদের বদলিতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

ময়মনসিংহসহ খাদ্য কর্মকর্তাদের বদলিতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নকে ঘিরে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়নি। তবে খাদ্য অধিদপ্তরে বদলি-পদায়নের জন্য নির্ধারিত নীতিমালা ও নিয়মিত আদেশ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো কর্মকর্তা পছন্দের কর্মস্থল, বদলি ঠেকানো কিংবা নির্দিষ্ট জায়গায় পদায়নের বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়, তা হলে সেটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সরকারি সেবার স্বচ্ছতার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

খাদ্য অধিদপ্তরের সরকারি নথিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, পদোন্নতি, যোগদান ও অতিরিক্ত দায়িত্ব সংক্রান্ত পৃথক আদেশ প্রকাশ করা হয়। ২০২৫-২৬ সময়ের জন্যও একাধিক কর্মকর্তার বদলি আদেশ প্রকাশ করেছে অধিদপ্তর। এর মধ্যে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং ময়মনসিংহ সিএসডির একজন সহকারী ব্যবস্থাপকের বদলি আদেশও রয়েছে। অর্থাৎ বদলি-পদায়ন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং এর লিখিত নথি সংরক্ষিত থাকার কথা।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নথিতে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নের জন্য ২০১৯ সালের নীতিমালা, যা ২০২২ সালে সংশোধন করা হয়েছে, তার উল্লেখ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য অধিদপ্তরাধীন ক্যাডার ও নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি, চাকরি স্থায়ীকরণ, ছুটি, প্রেষণ ও অবসর সংক্রান্ত বিষয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।

ময়মনসিংহ অঞ্চলে খাদ্য বিভাগের কার্যক্রমের পরিধিও বিস্তৃত। আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের অধীনে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর জেলার খাদ্য কার্যালয় রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্মস্থল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত খাদ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিতরণ এবং সরকারি খাদ্য কর্মসূচির প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বদলি নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে প্রশ্ন আসে, কোনো কর্মকর্তা কেন নির্দিষ্ট কর্মস্থলে যেতে বা থাকতে আগ্রহী হন এবং সেই কর্মস্থলের সঙ্গে কোনো আর্থিক সুবিধা বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ জড়িত কি না। খাদ্য বিভাগের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, সরকারি গুদাম পরিচালনা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএসসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব রয়েছে। কর্মস্থলভিত্তিক প্রশাসনিক ক্ষমতা ও আর্থিক কার্যক্রমের সুযোগ থাকায় বদলি প্রক্রিয়ায় অনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ময়মনসিংহে খাদ্য বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে সাম্প্রতিক সময়েও অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের জুনে ময়মনসিংহ বিভাগের একটি কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারে কাগজপত্রে কয়েক শ টন গম উত্তোলন দেখানো হলেও বাস্তবে তা গুদামে থাকার বিষয়টি জেলা প্রশাসনের অভিযানে সামনে আসে বলে সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটি খাদ্যগুদাম ব্যবস্থাপনায় নথি, মজুত ও বাস্তব অবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

এ ধরনের প্রেক্ষাপটে বদলি-পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগটি সত্য হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি তা সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। আবার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না থাকলে নিরপরাধ কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই ব্যক্তির নাম প্রকাশের আগে অভিযোগের ভিত্তি, নথি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।

খাদ্য অধিদপ্তরের বদলি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ, বদলির কারণ ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের নথি সংরক্ষণ এবং আদেশের যথাযথ প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করছেন কি না, বদলির পরপরই আবার পরিবর্তনের কারণ কী এবং কোনো নির্দিষ্ট পদ বা কর্মস্থলকে ঘিরে অস্বাভাবিক আগ্রহ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও প্রশাসনিক নজরদারির আওতায় রাখা যেতে পারে।

খাদ্য অধিদপ্তর ২০২৬ সালের এপ্রিলে এলএসডি, সিএসডি ও সাইলোতে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বদলি বা পদায়ন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার বিষয়ে একটি অফিস আদেশও প্রকাশ করেছিল। এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কারণ ও প্রয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলে বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্নের সুযোগ কমে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এ সরকারি সেবায় ঘুষ, মধ্যস্থতাকারী নির্ভরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও সরকারি দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রশাসনিক পদায়ন যদি অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত নাগরিক সেবা ও সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় পড়তে পারে।

তবে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ প্রমাণের জন্য নির্দিষ্ট লেনদেন, যোগাযোগ, নথি, সাক্ষ্য বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু কোনো কর্মকর্তা পছন্দের জায়গায় বদলি হয়েছেন বা দ্রুত বদলি পেয়েছেন—এটিকে আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আবেদনকারী এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করাই আইনসম্মত ও ন্যায়সংগত পথ।

খাদ্য বিভাগের বদলি-পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তাই এখন মূলত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। অভিযোগের সত্যতা থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুনাম রক্ষার ব্যবস্থা—দুই দিকই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি খাদ্য ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বদলি যেন প্রশাসনিক প্রয়োজন ও জনস্বার্থের ভিত্তিতেই হয়, ব্যক্তিগত বা আর্থিক প্রভাবের ভিত্তিতে নয়—এটাই নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।