সারাদেশ

রংপুরে সড়ক-ত্রাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

রংপুরে সড়ক-ত্রাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর

রংপুরে সরকারি উন্নয়ন ও ত্রাণ সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ, কাজ বাস্তবায়ন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন ঘিরে অভিযোগের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান ও তদন্তের ঘটনাও সামনে এসেছে। বিশেষ করে পীরগঞ্জের টেস্ট রিলিফ (টিআর) প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ এবং পীরগাছার আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের তদন্ত সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির প্রশ্নকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।

২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পীরগঞ্জ উপজেলায় টিআর প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ ওঠার কথা জানানো হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করা হলেও অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়। এ ধরনের প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ যথাযথ কাজে ব্যয় হয়েছে কি না, প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তব অগ্রগতি এবং সুবিধাভোগীদের তালিকা বিধি অনুযায়ী করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে পীরগাছার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হক সুমনের বিরুদ্ধে আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুদক নতুন করে তদন্ত শুরু করে। অভিযোগের সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচিতে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ও যুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি, বরাদ্দ, ব্যয় এবং বাস্তব কাজ যাচাই করছে তদন্তকারী সংস্থা।

ত্রাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রংপুর সদরেও উঠেছে। প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুদান বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে দুদকের রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় অভিযান চালিয়েছে। এ ধরনের অনুদান প্রকল্পে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সহায়তা পেয়েছেন কি না এবং বরাদ্দের অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা যাচাই করা দুদকের অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।

সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও সরকারি অর্থ ব্যয় নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। রংপুর অঞ্চলে সড়ক নির্মাণ, সংস্কার ও স্থানীয় উন্নয়নকাজে ঠিকাদারি প্রক্রিয়া, কাজের পরিমাণ, উপকরণের মান, বিল পরিশোধ এবং প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে তা নথিভিত্তিক তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলে কারা অর্থ দাবি করেছেন, কার কাছ থেকে কীভাবে অর্থ নেওয়া হয়েছে এবং এর বিনিময়ে কোনো সরকারি সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

ত্রাণ প্রকল্পের অনিয়মের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি পড়ে। দুর্যোগ বা দারিদ্র্যের কারণে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল মানুষ যদি প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। একইভাবে সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের কাজে অর্থের অপব্যবহার হলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থেরও অপচয় হতে পারে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এ সরকারি সেবা ও বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে রংপুরের স্থানীয় প্রকল্পগুলোতে অনিয়মের অভিযোগকে শুধু বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি অর্থ বরাদ্দ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতির ঝুঁকি থেকেই যায়।

তবে কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা, দুদকের অভিযান কিংবা তদন্ত শুরু হওয়াকে অপরাধ প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, অর্থের ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং সরকারি বিধি লঙ্ঘনের বিষয় প্রমাণিত হলেই আইন অনুযায়ী দায় নির্ধারণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বক্তব্য নেওয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াও ন্যায়বিচারের অংশ।

সরকারি প্রকল্পে কমিশন বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রতিরোধে দরপত্র ও বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রকল্পের ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ, কাজের মান যাচাই, নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন। ত্রাণ প্রকল্পে সুবিধাভোগীর তালিকা প্রকাশ ও সামাজিক নজরদারি বাড়ানো হলে অনিয়মের সুযোগ কমতে পারে।

রংপুরের এসব অভিযোগ তাই কেবল কয়েকটি প্রকল্পের হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়; সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং সেই অর্থের সুফল প্রকৃত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না—সেই বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এনেছে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সরকারি প্রকল্পে জনগণের আস্থা ও অর্থের সুরক্ষা দুটিই জোরদার করা সম্ভব।