আইন ও আদালত

রংপুর বিআরটিএতে দালাল, ঘুষের অভিযোগ, দুদকের অভিযানে দুই দালাল আটক, জরিমানা

রংপুর বিআরটিএতে দালাল, ঘুষের অভিযোগ, দুদকের অভিযানে দুই দালাল আটক, জরিমানা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর

রংপুরের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা মানুষের কাছ থেকে ঘুষ আদায় ও হয়রানির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান চালানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর পরিচালিত ওই অভিযানে দুই দালালকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হলে প্রত্যেককে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

দুদক রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হোসাইন শরীফের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। আটক দুজন হলেন হাসানুর রহমান ও দেলোয়ার হোসেন। প্রকাশিত তথ্যে হাসানুর রহমানকে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এবং দেলোয়ার হোসেনকে নগরীর লালপুর এলাকার বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিআরটিএ কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আসা ব্যক্তিদের ইচ্ছাকৃতভাবে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে পরে দালালের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে কাজ করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগ ছিল, এভাবে লাইসেন্সের কাজ করাতে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের কর্মকর্তারা কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে দালালদের কথাবার্তা পর্যবেক্ষণ করেন। পরে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।

অভিযানের পর বিষয়টি শুধু দুই দালাল আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিআরটিএ কার্যালয়ের সেবা ব্যবস্থায় ঘুষ, অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগের উৎস এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের বিষয়ও সামনে আসে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রংপুরের ঘটনাটি বিআরটিএর মতো নাগরিকসেবা প্রতিষ্ঠানে মধ্যস্থতাকারী নির্ভরতার ঝুঁকিও সামনে আনে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো সেবা নির্ধারিত সরকারি ফি ও নিয়মে পাওয়ার কথা থাকলেও দালালের মাধ্যমে দ্রুত কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে সেবাগ্রহীতার অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাও কমে যায়।

এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। কারণ কেবল কার্যালয়ের বাইরে অবস্থানকারী মধ্যস্থতাকারীদের আটক করলেই যদি অভিযোগের মূল কারণ দূর না হয়, তাহলে একই ধরনের দালালচক্র পুনরায় সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এও নাগরিক সেবা গ্রহণে ঘুষ ও মধ্যস্থতাকারী নির্ভরতার বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে বিআরটিএসহ বিভিন্ন সেবা খাতে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার। সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে রংপুর বিআরটিএর এই ঘটনা একটি স্থানীয় কার্যালয়ের অভিযোগ হলেও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ ও দালালনির্ভরতার কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে এর যোগ রয়েছে।

তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, আটক বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি বলা যায় না। কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টতা ও দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের প্রকৃতি, অর্থের পরিমাণ এবং কার কাছে অর্থ গেছে, তা নথি ও সাক্ষ্যের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

বিআরটিএর সেবা ব্যবস্থায় দালালের ভূমিকা কমাতে আবেদন, ফি প্রদান, পরীক্ষা, ফলাফল ও লাইসেন্স বিতরণের প্রতিটি ধাপ আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করার পাশাপাশি কার্যালয়কেন্দ্রিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিও সেবাগ্রহীতাদের আস্থা বাড়াতে পারে।

রংপুর বিআরটিএতে দুই দালাল আটকের ঘটনাটি তাই কেবল একটি অভিযান ও জরিমানার খবর নয়। এটি নাগরিক সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়, মধ্যস্থতাকারীর প্রভাব এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনে। নিয়মিত অভিযান, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দালালনির্ভরতার সুযোগ বন্ধ করা গেলে বিআরটিএর সেবা ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের হয়রানি ও অতিরিক্ত ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে।