আইন ও আদালত

রাজশাহীতে বিআরটিএ-পৌরসভায় অনিয়মের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিআরটিএ-পৌরসভায় অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

রাজশাহীতে সরকারি সেবা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রাজশাহী কার্যালয়ে ঘুষ না দিলে ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়ে নথিপত্র জব্দ করেছে। একই সময়ে জেলার চারঘাট পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগেও দুদকের অভিযানে বিভিন্ন অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে।

বিআরটিএ কার্যালয় ঘিরে অভিযোগটি মূলত ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। দুদকের রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয় অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনসংক্রান্ত নথি জব্দ করে। দুদক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘুষ না দিলে অনেক আবেদনকারীকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া হয়এমন অভিযোগ কমিশনের কাছে আসার পর অভিযানটি পরিচালিত হয়।

অভিযানের সময় জব্দ করা নথির ভিত্তিতে লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁরা ঘুষ দিয়েছেন কি না, তা যাচাই করার কথা জানিয়েছে দুদক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কমিশনে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজশাহীর বিআরটিএ কার্যালয়ের এই অভিযোগের সঙ্গে টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এর বৃহত্তর চিত্রেরও একটি সম্পর্ক রয়েছে। জরিপে সেবা নিতে গিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবারের ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে লাইসেন্সের মতো নাগরিক সেবায় ঘুষের অভিযোগ শুধু একটি কার্যালয়ের প্রশাসনিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়; এটি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকের সমান সুযোগ প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয়ও সামনে আনে।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার পর্যায়েও অনিয়মের অভিযোগের উদাহরণ রয়েছে। রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভায় প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থানীয় সরকার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট অভিযান চালায়। দুদকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হয়েছে।

পানি সরবরাহের মতো মৌলিক নাগরিক সেবার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের গুরুত্ব আলাদা। ধরনের প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি মানুষের নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকারও যুক্ত থাকে। ফলে প্রকল্পের কাজের মান, অর্থের ব্যবহার, ঠিকাদারি প্রক্রিয়া, বিল পরিশোধ এবং বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে নথিপত্রের সামঞ্জস্য যাচাই করা জরুরি।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও নগর সেবা, রাজস্ব প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জনসমক্ষে প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটির সরকারি ওয়েবসাইটে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা, বাজেট, প্রকল্প চলমান কর্মসূচির তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য রাখা হলে সরকারি অর্থ ব্যয় সেবা কার্যক্রমে নাগরিক নজরদারি বাড়তে পারে।

বিআরটিএর ক্ষেত্রে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু যেখানে সেবার বিনিময়ে ঘুষ এবং দালালনির্ভরতার আশঙ্কা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশ্নটি সেখানে সরকারি প্রকল্পের অর্থ বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা নিয়ে। দুটি ক্ষেত্রেই নাগরিকের অর্থ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা জড়িত। একটি ক্ষেত্রে নাগরিক সরাসরি সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করছেন, অন্য ক্ষেত্রে সরকারি অর্থে নির্মিত সেবার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে।

তবে অভিযোগ, দুদকের অভিযান বা নথি জব্দের ঘটনাকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিআরটিএর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্য যাচাই করতে হবে। একইভাবে পৌর প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রকল্পের নথি, কাজের বাস্তব অবস্থা, অর্থ পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা পরীক্ষা করেই দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

সুশাসনের দৃষ্টিতে এসব ঘটনার গুরুত্ব হলো, নাগরিক সেবা স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পদুই ক্ষেত্রেই নিয়মের ব্যত্যয় হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। ঘুষের কারণে সেবা ব্যয় বাড়ে, সময় নষ্ট হয় এবং নাগরিকের হয়রানি বাড়ে। আবার প্রকল্পে অনিয়ম হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং কাঙ্ক্ষিত সেবার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

রাজশাহীর বিআরটিএ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অভিযোগগুলো তাই বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখার পাশাপাশি সেবা প্রদান, সরকারি অর্থ ব্যয় এবং জবাবদিহির বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যেও দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সেবাপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে নাগরিক আস্থা পুনর্গঠনের পথ তৈরি হতে পারে।