সারাদেশ

খুলনা বিআরটিএতে দালাল ধরল দুদক

খুলনা বিআরটিএতে দালাল ধরল দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা

খুলনা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে ঘুষ দালালচক্রের অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের মে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে দুদক কর্মকর্তাদের কাছে ঘুষ দাবি করার অভিযোগে আব্বাস আলী নামে এক দালালকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেন।

দুদকের খুলনা জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ওই অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযোগ ছিল, বিআরটিএ কার্যালয়ে বিভিন্ন সেবা নিতে আসা মানুষের কাছ থেকে দালালেরা অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। বিশেষ করে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেসসহ বিভিন্ন সেবা দ্রুত করে দেওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।

অভিযানের সময় দুদকের কর্মকর্তারা সেবাগ্রহীতার পরিচয়ে কার্যালয়ে গিয়ে দালালচক্রের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। সময় আব্বাস আলী তাঁদের কাছেও ঘুষ দাবি করেন বলে দুদক জানায়। পরে তাকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে নেওয়া হয় এবং আদালত কারাদণ্ড দেন।

ঘটনাটি শুধু একজন দালাল আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, খুলনা বিআরটিএর অভিযান সেটিও সামনে এনেছে। নির্ধারিত সরকারি ফি নিয়ম মেনে সরাসরি সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও কোনো সেবাগ্রহীতা যদি কাজ দ্রুত করার জন্য দালালের কাছে যেতে বাধ্য হন, তাহলে সরকারি সেবা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

খুলনা বিআরটিএতে দালালচক্রের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে একই কার্যালয়ে ্যাবের অভিযানে ২৫ জন দালালকে আটক করা হয়েছিল। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁদের মধ্যে ১৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং ছয়জনকে অর্থদণ্ড দেন। ওই সময়ও সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগের কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছিল।

এরও আগে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে খুলনাসহ কয়েকটি বিআরটিএ কার্যালয়ে যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে দুদক অভিযান চালিয়েছিল। অর্থাৎ দালালবিরোধী অভিযান একাধিক সময়ে পরিচালিত হলেও অভিযোগের পুনরাবৃত্তি থেকে বোঝা যায়, শুধু অভিযান তাৎক্ষণিক শাস্তি দিয়ে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান হয়নি।

তবে কোনো দালালকে আটক করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিআরটিএর সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত করা সমীচীন নয়। দালালদের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যোগসাজশ ছিল কি না, থাকলে কারা জড়িত এবং কীভাবে সরকারি সেবা প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হয়েছেএসব বিষয় প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন।

সরকারি সেবায় দালালনির্ভরতা কমাতে ডিজিটাল আবেদন, অনলাইন ফি পরিশোধ এবং আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের তথ্য সেবাগ্রহীতার কাছে সহজলভ্য করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কার্যালয়ে নির্ধারিত ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সেবার সময়সীমা অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ করা হলে মধ্যস্থতাকারীদের সুযোগ কমতে পারে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে কোনো ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, তদন্তে সেই ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে।

খুলনা বিআরটিএতে দুদকের অভিযান তাই কেবল একজন দালালকে আটকের ঘটনা নয়; এটি নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী নির্ভরতার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যারও প্রতিচ্ছবি। বারবার অভিযান পরিচালনার পরও যদি একই অভিযোগ ফিরে আসে, তাহলে দালাল ধরার পাশাপাশি দালাল তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে এমন প্রশাসনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করাই হবে কার্যকর সমাধানের পথ।

সাধারণ মানুষের ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন কিংবা ফিটনেস সনদ পাওয়া কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় সেবা। এসব সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া বা দালালের দ্বারস্থ হওয়া যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নিয়মিত নজরদারি, স্বচ্ছ সেবা প্রক্রিয়া, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিই পারে খুলনা বিআরটিএতে দালাল ঘুষের অভিযোগের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করতে।