নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পাঁচ কর্মীর বিরুদ্ধে ভুয়া চাহিদাপত্র ব্যবহার করে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে জ্বালানি তেল নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল হাবিব ফিলিং স্টেশনে সরকারি গাড়ি নিয়ে গিয়ে ব্যারেল ও ড্রামে তেল নেওয়ার সময় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ওই পাঁচ কর্মীকে নওহাটা স্টেশন থেকে প্রত্যাহার করে ঢাকায় সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনার তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নওহাটা ফায়ার সার্ভিসের পাঁচ কর্মী একটি সরকারি গাড়ি নিয়ে পবা উপজেলার হাবিব ফিলিং স্টেশনে যান। তাঁদের সঙ্গে একটি ব্যারেল ও ড্রাম ছিল। অফিসের প্রয়োজনে জ্বালানি নেওয়ার কথা বলে একটি চাহিদাপত্রও দেওয়া হয়। ওই চাহিদাপত্রে নওহাটা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দ্বিতীয় কর্মকর্তা রবিউল আলমের স্বাক্ষর ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিলিং স্টেশনে প্রথমে ২০০ লিটার পেট্রোল এবং পরে আরও ১০০ লিটার অকটেন নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ মোট ৩০০ লিটার জ্বালানি উত্তোলনের ঘটনা ঘটে। পরে চাহিদাপত্রটি যথাযথ ছিল না এবং অফিসের প্রয়োজনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নেই—এমন বিষয় সামনে এলে ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নেওয়া জ্বালানি শেষ পর্যন্ত ফিলিং স্টেশনে ফেরত দেওয়া হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট পাঁচ কর্মীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত এবং প্রত্যাহার—দুই ধরনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও তদন্তের ফলাফলই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে আসে, যখন রাজশাহীতে জ্বালানি তেল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংকট ও দীর্ঘ অপেক্ষার অভিযোগ ছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক মোটরসাইকেলচালক রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পাচ্ছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া চাহিদাপত্র ব্যবহার করে অতিরিক্ত জ্বালানি নেওয়ার অভিযোগ জনস্বার্থের দিক থেকেও গুরুত্ব বহন করে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে চাহিদাপত্র, অনুমোদন, বরাদ্দ এবং উত্তোলনের হিসাব থাকার কথা। কোনো কর্মী অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে চাহিদাপত্র তৈরি বা ব্যবহার করে থাকলে সেটি প্রশাসনিক অনিয়মের পাশাপাশি সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে চাহিদাপত্র কে তৈরি করেছেন, কার অনুমোদন ছিল, জ্বালানি কোন কাজে ব্যবহারের কথা ছিল এবং উত্তোলনের পর তা কোথায় যাওয়ার কথা ছিল—তদন্তে এসব বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তবে অভিযোগ ওঠা বা প্রশাসনিকভাবে প্রত্যাহার করা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি বলা যায় না। তদন্তে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা, চাহিদাপত্রের সত্যতা, জ্বালানি উত্তোলনের উদ্দেশ্য এবং সরকারি সম্পদের প্রকৃত ব্যবহার যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সঙ্গে যাঁদের সংশ্লিষ্টতা নেই, তাঁদের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়াও জরুরি।
ফায়ার সার্ভিস একটি জরুরি জনসেবা প্রতিষ্ঠান। অগ্নিকাণ্ড, উদ্ধার অভিযান ও দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যবহৃত যানবাহনের জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় চাহিদাপত্র থেকে উত্তোলন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের হিসাব সংরক্ষণ এবং নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজশাহীর নওহাটা স্টেশনের এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিষ্পত্তি হয়, তা নির্ভর করবে তদন্তের ফলাফলের ওপর। তবে ঘটনাটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নথি যাচাই, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। সরকারি সম্পদের ব্যবহার যাতে ব্যক্তিগত স্বার্থে না যায়, সে জন্য একই সঙ্গে প্রশাসনিক নজরদারি ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।