নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
খুলনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) আওতাধীন সড়ক ও সেতু প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত জোরদার হয়েছে। কোথাও কাজ শেষ না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগ, কোথাও বছরের পর বছর প্রকল্প ঝুলে থাকা, আবার কোনো প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর ঘটনায় সরকারি অর্থের ব্যবহার ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে কয়েকটি অভিযোগে নথিপত্র সংগ্রহ, সরেজমিন পরিদর্শন ও কাজের মান যাচাই করেছে।
সাম্প্রতিক আলোচনায় এসেছে খুলনার দাকোপ উপজেলার এলজিইডির তিনটি সেতু প্রকল্প। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, তিন প্রকল্পে কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও প্রায় ২৩ কোটি টাকার চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি সেতুতে প্রায় ২০ শতাংশ কাজ বাকি থাকার অভিযোগ রয়েছে। আরেকটি প্রকল্পে সংযোগ সড়ক বা অ্যাপ্রোচ নির্মাণ সম্পন্ন না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের কার্যাদেশ, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, বাস্তব অগ্রগতি ও নির্মাণকাজের মান যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর আগে খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও অনিয়মের অভিযোগে দুদক সরেজমিন তদন্ত করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম কেডিএ কার্যালয়ে গিয়ে প্রকল্পের নথি, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের রসিদ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংগ্রহ করে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সড়কের কাজের মান, অগ্রগতি এবং নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণ যাচাই করা হয়। অভিযোগ ছিল, কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৭০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে।
শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু কাজের মান বা বিল পরিশোধ নয়, দীর্ঘসূত্রতাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত হয়। দুই বছরে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও বাস্তবে নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় কাজ চলার পরও প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। প্রকল্পের ঠিকাদার বিল তুলে নেওয়ার পর কাজ বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে এবং ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট ঠিকাদারি চুক্তি বাতিল করা হয়।
প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধিও আলাদা করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রথমে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। পরে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়তে বাড়তে ২৫৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয় এবং পরবর্তী সংশোধনে তা সামান্য কমিয়ে প্রায় ২৫৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ দুই বছরের একটি প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ সম্পূর্ণ হয়নি এবং ব্যয়ও আড়াই গুণের বেশি বেড়েছে।
এই দীর্ঘসূত্রতার কারণ খতিয়ে দেখতে ২০২৬ সালের জুনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পের নির্ধারিত উদ্দেশ্য কেন অর্জিত হয়নি এবং এর জন্য কারা দায়ী, তা অনুসন্ধানের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
খুলনার সড়ক ও সেতু প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ অবশ্য শুধু সাম্প্রতিক তিনটি প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুদক দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলজিইডির সড়ক ও সেতু প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করতে অভিযান চালায়। একই অভিযানে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার তিনটি এলজিইডি প্রকল্পে ৩৪৩ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন না করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করা হয়। একটি ৩০ মিটার দীর্ঘ গার্ডার সেতু নির্মাণ না করেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও অভিযানে পাওয়া যায় বলে বাসস জানিয়েছিল।
খুলনার ক্ষেত্রে অভিযোগগুলোর গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ সড়ক ও সেতু নির্মাণ শুধু সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি মানুষের যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির সম্পর্ক রয়েছে। একটি সেতু নির্মাণের পর সংযোগ সড়ক না থাকলে বা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বছরের পর বছর অসমাপ্ত থাকলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
তবে কোনো প্রকল্পে বিল পরিশোধ, কাজের ধীরগতি বা ব্যয় বৃদ্ধির তথ্য থাকলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা ঠিকাদারকে দুর্নীতির জন্য দায়ী করা যায় না। প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনুমোদন, ঠিকাদারি জটিলতা কিংবা অন্য বাস্তব কারণেও সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে। তাই অভিযোগের প্রতিটি দিক নথি, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দেওয়াও একইভাবে জরুরি।
সড়ক ও সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর অডিট বা তদন্ত যথেষ্ট নয়। কার্যাদেশ থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে কাজের অগ্রগতি, পরিমাপ, বিল এবং উপকরণের মান ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও পরিশোধিত বিলের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে দ্রুত তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
খুলনায় চলমান অভিযোগ ও তদন্ত তাই স্থানীয় উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। একটি প্রকল্প কত টাকায় অনুমোদিত হলো, কতবার সংশোধন হলো, কত টাকা ব্যয় হলো এবং বাস্তবে কতটুকু কাজ হলো—এই চারটি প্রশ্নের উত্তর যদি সহজে পাওয়া যায়, তাহলে অনিয়মের সুযোগ অনেকটাই কমবে। জনগণের অর্থে নির্মিত সড়ক ও সেতু যেন কাগজে নয়, বাস্তবেই মানুষের চলাচল ও অর্থনীতির কাজে আসে, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধান দায়িত্ব।