নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলিকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান বন সংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরীর নন্দনকানন এলাকায় প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে বদলি-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি সংগ্রহ ও জব্দ করে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১-এর একটি দল। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে একই দিনে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধীন ১০টি বন বিভাগের ৭৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি এবং তাঁদের পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের প্রক্রিয়া।
দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি একযোগে ৭৭ জন বন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব বদলির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত বা সুবিধাজনক কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। তবে এই অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, কারা অর্থ দিয়েছেন, কারা গ্রহণ করেছেন এবং অর্থের কোনো অংশ কোথায় গেছে—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার কথা।
দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এর সহকারী পরিচালক সাঈদ মাহমুদ ইমরান তখন জানিয়েছিলেন, প্রধান বন সংরক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বদলির আদেশ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মস্থল, আবেদন, সুপারিশ এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বদলি ও পদায়ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম হলেও কোনো কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট কর্মস্থলে পাঠানোর বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তা সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার জন্য গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের পদগুলোতে কর্মস্থলের ধরন ও অবস্থান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব ও সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় বদলি সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের গুরুত্বও বেড়ে যায়।
চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বন ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের অধীন বিভিন্ন বন বিভাগে সংরক্ষিত বন, পাহাড়ি বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক পদায়নে অনিয়মের অভিযোগ শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি সুবিধার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে বন সংরক্ষণ, অবৈধ দখল ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও যুক্ত হতে পারে। তবে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগের সঙ্গে এসব অনিয়মের সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া বলা যায় না।
মোল্লা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে এর আগেও ফেনীতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে একটি প্রকল্পে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কথা দুদকের অভিযানের সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই অভিযোগও পৃথকভাবে যাচাইয়ের বিষয়। কোনো প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কি না, হলে কীভাবে হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ঠিকাদারদের ভূমিকা কী ছিল—এসব নির্ধারণে প্রকল্পের অনুমোদন, কাজের পরিমাণ, বিল-ভাউচার, পরিমাপ ও অর্থ ছাড়ের নথি পরীক্ষা প্রয়োজন।
বদলি বাণিজ্যের অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ৭৭ জনের বদলি কেন একই সময়ে করা হয়েছিল এবং তাঁদের পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো অস্বাভাবিক প্যাটার্ন ছিল কি না। কারও আবেদন বা প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে বদলি হয়েছে, নাকি অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থল নির্ধারণ করা হয়েছিল—এটি প্রমাণের জন্য নথির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্যও প্রয়োজন। একই সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকলে ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা যাচাই তদন্তকে আরও স্পষ্ট করতে পারে।
এ ধরনের অভিযোগে শুধু একজন কর্মকর্তাকে দায়ী করলেই পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। বদলির প্রস্তাব কে তৈরি করেছেন, অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে কারা ছিলেন, আদেশ বাস্তবায়নে কার ভূমিকা ছিল এবং কোনো মধ্যস্থতাকারী অর্থ সংগ্রহ করেছেন কি না—এসব প্রশ্নও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন। কারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সাধারণত একাধিক স্তরের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে কার্যকর হয়।
২০২৬ সালেও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন বিভাগে বদলি ও প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত অভিযোগগুলোকে ২০২৫ সালের দুদকের অনুসন্ধানের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই, যতক্ষণ না তদন্তকারী সংস্থা সেগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করে। দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনে পুরোনো অনুসন্ধান, নতুন অভিযোগ এবং প্রমাণিত তথ্য আলাদাভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।
দুদকের অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অভিযোগের আর্থিক ও প্রশাসনিক সত্যতা নির্ধারণ করা। প্রায় ১০ কোটি টাকার কথিত লেনদেনের দাবি সত্য হলে অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ এবং অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ থাকলে তা উদ্ধারের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আবার অভিযোগের কোনো অংশ প্রমাণিত না হলে সেটিও তদন্তের ফলাফলের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান বা নথি জব্দের ঘটনা নিজেই অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। অভিযোগের সত্যতা তদন্ত, প্রমাণ এবং প্রয়োজন হলে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তাই প্রশাসনিক ও আইনগত অবস্থান পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত না করে অভিযোগের প্রকৃতি ও তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরা জরুরি।
বন বিভাগের মতো একটি সংস্থায় বদলি যদি অর্থের বিনিময়ে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধু আর্থিক দুর্নীতি নয়, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারেরও উদাহরণ হবে। কারণ পদায়নকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম বানানো হলে যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ ও জনস্বার্থের পরিবর্তে অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা প্রভাব সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ পায়।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান বন সংরক্ষকের বিরুদ্ধে প্রায় ১০ কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ তাই একটি নির্দিষ্ট বদলি আদেশের তদন্তের বাইরে প্রশাসনিক জবাবদিহির বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে। ৭৭ কর্মকর্তার বদলি ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা, অর্থের প্রকৃত পরিমাণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্তে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। দুদকের নথি বিশ্লেষণ ও পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদনই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে অভিযোগের ভিত্তি কতটা এবং দায় কার।