সর্বশেষ

রাজধানীতে ১৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং সারাদেশে লোডশেডিং ২৫০০ মেগাওয়াট

রাজধানীতে ১৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং সারাদেশে লোডশেডিং ২৫০০ মেগাওয়াট

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চলতি মাসের শুরু থেকে গ্রামগুলোতে বিদ্যুতের সরবরাহ একেবারে কমেছে। এলাকাভেদে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কিন্তু ঢাকাসহ বড় শহরের নাগরিকরা বেশ স্বস্তিতে রয়েছেন। এ নিয়ে সমালোচনার মাঝে  ২৩ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, গ্রাম-শহরে বিদ্যুৎ বৈষম্য কমাতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পরই স্বল্প পরিসরে লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হয় রাজধানীবাসী। গতকাল শনিবার ছুটির দিনেও ১৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

রাজধানীর দুই বিতরণ কোম্পানি– ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ (ডিপিডিসি) এবং ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) মোট বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। ডিপিডিসিতে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা করে দুবার লোডশেডিং করা হয়। এ সময়ে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল দুপুর ১টায়– দুই হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছিল এক হাজার ৯৪৮ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল এক হাজার ১২ মেগাওয়াট। বিকেল ৩টায় লোডশেডিং ছিল ৭৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি মেটাতে ডিপিডিসি দিনে এক ঘণ্টা করে দুবার লোডশেডিং করে।

ডেসকোর তথ্য অনুসারে, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। এ জন্য এলাকাভেদে সন্ধ্যার আগে এক ঘণ্টার লোডশেডিং করা হয়েছিল। সংস্থাটির বিদ্যুৎ চাহিদা এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

রাজধানীর বেইলি রোডের বাসিন্দা ধীমান চন্দ্র রায় বলেন, লোডশেডিং হচ্ছে, তবে সেটি দিনে হলে ভালো হতো। হচ্ছে রাতে। বৃহস্পতিবার রাত ৩টায় আর শুক্রবার ভোর ৫টায় বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে গরমে ঘুম ভেঙে যায়। দুই দিনই আধাঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়।

চট্টগ্রামে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং
গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সূত্র জানায়, ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ। বাকি কেন্দ্রগুলোও সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন করছে। এতে দিনে গড়ে ১৭০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

রাঙামাটির কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পানির স্তর কমে যাওয়ায় পাঁচ ইউনিটের চারটি বন্ধ রয়েছে। ২৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট। কয়লা সংকটেও বড় ধাক্কা লেগেছে উৎপাদনে। বাঁশখালীর এস এস পাওয়ার প্লান্টে এক হাজার ২২৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন নেমেছে প্রায় ৬১২ মেগাওয়াটে।

একইভাবে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৩৫ মেগাওয়াটে। এ অবস্থায় নগরের প্রায় সব এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একাধিকবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে বারবার লোডশেডিংয়ে জনজীবনে ভোগান্তি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন।

সার্বিক চিত্র
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকেল ৪টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৯০৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাস দিয়ে উৎপাদন হয় পাঁচ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াট, তেল দিয়ে এক হাজার ৫৩ মেগাওয়াট, কয়লা দিয়ে চার হাজার ৪৩৭ মেগাওয়াট, জলবিদ্যুৎ ৪০ মেগাওয়াট, বায়ুবিদ্যুৎ ২২ মেগাওয়াট এবং সৌরবিদ্যুৎ ২৯৭ মেগাওয়াট। এ ছাড়া ভারত থেকে এক হাজার ৫৮ মেগাওয়াট এবং দেশটির বিদ্যুৎ কোম্পানি আদানি পাওয়ার থেকে ৭৬১ মেগাওয়াট আমদানি করা হয়েছে।

গতকাল দেশে সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছিল দিনে ১৫ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট এবং রাতে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। পিজিসিবির সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, গতকাল বিকেল ৪টায় চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১২ হাজার ৩৩৩ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ৩৩৭ মেগাওয়াট। শুক্রবার রাত ২টায় লোডশেডিং হয়েছিল দুই হাজার ৭৫৪ মেগাওয়াট। তবে এটা সরকারি হিসাব। বিতরণ কোম্পানির অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুসারে, লোডশেডিং প্রকৃত পক্ষে চার হাজার মেগাওয়াটের বেশি হচ্ছে। কারণ, ছয় বিতরণ কোম্পানির মধ্যে শুধু পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) লোডশেডিং গড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে গ্রামে ভোগান্তি
দেশজুড়ে তীব্র গরমের সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে গ্রামীণ জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নীলফামারীর সৈয়দপুরে দিনে মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরে লোডশেডিং হচ্ছে সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কোথাও কোথাও একবার বিদ্যুৎ গেলে কয়েক ঘণ্টায়ও ফেরে না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে সরাইলে থানায় দায়িত্বে থাকা তিন পুলিশ সদস্য অচেতন হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয়রা বলছেন, রাতে টানা লোডশেডিংয়ে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি কষ্ট পাচ্ছেন।

এদিকে কয়েকটি এলাকায় লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মিছিল হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় স্থানীয় যুবকদের বিক্ষোভে সড়ক বাজার এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।

রংপুর বিভাগে সাত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ
তীব্র তাপদাহে উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। রংপুর বিভাগের ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সাতটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বন্ধ কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট।

চলমান কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও নেমে এসেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশে। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, আট জেলায় (রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়) চাহিদা ৮৫০-৯০০ মেগাওয়াট হলেও মিলছে ৭০০-৭২০ মেগাওয়াট।

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটই বন্ধ। এগুলোর মোট সক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট। এ ছাড়া পার্বতীপুরের ১৬০ মেগাওয়াট কেন্দ্র, সৈয়দপুরের ১৫০ ও ২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রও অচল। রংপুরের ২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র বন্ধ, অন্য কেন্দ্রগুলোও আংশিক উৎপাদনে চলছে।

শিল্প উৎপাদন ব্যাহত
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও খারাপ। আশুলিয়ায় সম্প্রতি দিনের বেলায় ছয় ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ ছিল না। অথচ একটি কারখানা সাধারণত দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা চালু থাকে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে ভালুকা, শ্রীপুর ও রাজেন্দ্রপুরের মতো পল্লী বিদ্যুৎনির্ভর এলাকায় সংকট বেশি প্রকট।