বাগেরহাট প্রতিনিধি
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নাঈম খানের বিরুদ্ধে এক তরুণীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে আদালতে করা মামলাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের পাশাপাশি মুঠোফোনের কল রেকর্ড, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পরীক্ষা করা হোক। তবে আদালতে করা অভিযোগের সত্যতা বা মিথ্যতা এখনো বিচারিকভাবে নির্ধারিত হয়নি।
জানা গেছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত এক তরুণীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কিশোরগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ নাঈম খান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। আদালত অভিযোগটি গ্রহণ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অপহরণ ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে এর সত্যতা নির্ধারণে আইনসম্মত ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন নাঈমের পরিবার ও স্থানীয়রা।
নাঈম খানের পরিবারের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই তরুণীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে মুঠোফোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কিছুদিন তাঁদের কথাবার্তা হয়। একবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাঁদের অল্প সময়ের জন্য দেখা হয়েছিল। পরিবারের দাবি, এর বাইরে তাঁদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, নাঈমকে সামাজিক ও পেশাগতভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, গত ২৯ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে ওই তরুণী ভাড়ায় নেওয়া মোটরসাইকেলে নাঈম খানের বাড়ির সামনে যান। বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় কয়েকজন সেখানে উপস্থিত হন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ওই তরুণী নাঈমকে বিয়ে করবেন বলে তাঁর বাড়িতে এসেছেন বলে জানান। ওই সময় নাঈম খান বাড়িতে ছিলেন না বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন।
নাঈম খানের বাবা খান মনিরুজ্জামান দুলাল বলেন, ২৯ জুলাই বাজারে যাওয়ার সময় এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তরুণী তাঁকে নাঈমের বাবা কি না জানতে চান। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি নাঈম তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানান এবং নাঈম কোথায় আছেন জানতে চান। পরে ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বললে নাঈম তাঁকে জানান, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং ওই তরুণীর সঙ্গে কয়েকদিন শুধু ফোনে কথা হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্থানীয়দের সিদ্ধান্তে ওই তরুণীকে নাঈমের বন্ধু হৃদয়ের বাড়িতে রাখা হয়। পরে তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জসিম তালুকদারের বাড়িতেও কয়েকদিন অবস্থান করেছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বর্তমানে ওই তরুণী এলাকায় নেই বলেও তাঁরা জানান।
নাঈমের বন্ধু হৃদয় বলেন, ওই তরুণী নাঈমকে বিয়ের দাবিতে তাঁর বাড়ির সামনে অবস্থান করছিলেন। বিষয়টি জানার পর স্থানীয়দের সিদ্ধান্তে রাতে তাঁকে তাঁর বাড়িতে রাখা হয়। পরদিন তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির বাড়িতে অবস্থান করেন বলে জানান হৃদয়। তাঁর দাবি, নাঈমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা খান আবদুল বাহার, খান কবির হোসেন ও আয়েশা সিদ্দিকা জেবুসহ কয়েকজনের দাবি, ২৯ জুলাই ওই তরুণী নাঈমের বাড়ির সামনে অবস্থান করলেও তাঁরা নাঈমকে সেখানে দেখেননি। তাঁদের মতে, ঘটনার প্রকৃত তথ্য জানতে ওই দিনের মুঠোফোনের কল রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তাঁরা।
ওই তরুণীকে মোটরসাইকেলে নেওয়া চালক শাহাদাত হোসেন জানান, ২৯ জুলাই বিকেলে বৃষ্টির মধ্যে একজন তরুণী মোড়েলগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে তাঁর মোটরসাইকেলে পাঁচগাঁও বাজারে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি ভাড়া পরিশোধ করেন এবং শাহাদাত ফিরে আসেন। তিনি ওই তরুণীকে যাত্রী হিসেবে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তাঁর কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।
নাঈম খান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অপহরণ, আটকে রাখা কিংবা অচেতন করার অভিযোগ ভিত্তিহীন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ওই তরুণীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল এবং একবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অল্প সময়ের জন্য দেখা হয়েছিল বলে জানান তিনি। এর বাইরে আর কোনো ঘটনা ঘটেনি দাবি করে নাঈম বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। আদালতে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছেন বলেও জানান। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে অভিযোগটি প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।
অভিযোগকারী তরুণীর বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। তাঁর পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি। গুরুতর যৌন সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষা করে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
ঘটনার দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য থাকায় তদন্তে মুঠোফোনের তথ্য, অবস্থানসংক্রান্ত প্রযুক্তিগত উপাত্ত, যাতায়াতের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং আদালতে দাখিল করা নথি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এসব তথ্য যাচাই করেই অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে বিচার শেষ হওয়ার আগে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও আইনসম্মত নয়। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং আইনসম্মত প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারিত হওয়াই প্রত্যাশিত।