বিশ্ব

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার: সমাপ্ত হলো ১২ বছরের সামরিক অভিযান, নতুন অধ্যায়ে বাগদাদ

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার: সমাপ্ত হলো ১২ বছরের সামরিক অভিযান, নতুন অধ্যায়ে বাগদাদ

 

মার্কিন বাহিনীর প্রস্থান ও এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে ইরাক সরকার চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। তবে সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের সার্বিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

৩০ সেপ্টেম্বর: দুই বছরব্যাপী প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাগদাদ ও ওয়াশিংটনের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুই ধাপে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করা হয়।

  • প্রথম ধাপ: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাকের অভ্যন্তরে সব ধরনের সরাসরি যুদ্ধ ও অভিযানের সমাপ্তি।

  • দ্বিতীয় ধাপ: ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিরিয়ায় আইএস-বিরোধী অভিযানে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর (বুধবার) হস্তান্তরের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া ওয়াশিংটনের ১২ বছরের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটলো। ২০০৭ সালে যেখানে ইরাকে ১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন সেনা ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূলত ২ হাজার ৫০০ সেনা উত্তর ইরাকে অবস্থান করছিল।

আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ

মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার সময় তাদের সাথে থাকা গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন এবং উন্নত গোয়েন্দা নজরদারি সরঞ্জাম সরিয়ে নিচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছে ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান রিজিওনাল গভর্নমেন্ট (কেআরজি)।

কুর্দি সামরিক বাহিনীর মতে, সম্প্রতি আঞ্চলিক উত্তেজনার মুখে কুর্দিস্তান অঞ্চলে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। কোনো বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না দিয়ে সেনা প্রত্যাহার করায় অঞ্চলটি অরক্ষিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তবে ইরাকি কর্তৃপক্ষের দাবি ভিন্ন। ইরাকি বিমান বাহিনীর প্রধান জানান, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশীয় এফ-১৬ (F-16) যুদ্ধবিমান ও নিজস্ব ড্রোন বহর দিয়ে সফলভাবে আকাশসীমা নজরদারি করা হচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

আইএসের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

এক দশক আগে ইরাকের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল দখল করে রাখা আইএস বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বর্তমানে তাদের মাত্র কয়েকশ সশস্ত্র যোদ্ধা অবশিষ্ট রয়েছে।

তবে বাগদাদের সামরিক কর্মকর্তারা জানান, মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আইএস সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নতুন করে হামলার ছক কষেছিল। যা প্রমাণ করে, বাহিনীটি দুর্বল হলেও তাদের গোপন সেলগুলো এখনো নিরাপত্তার ফাঁকফোকর ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

ইরাকের ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন বাহিনীর এই প্রস্থানকে তাদের বড় জয় হিসেবে দেখছে। তবে বাগদাদ সরকার কর্তৃক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সমর্পণের সময়সীমা ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করায় তাদের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, সৈন্য প্রত্যাহার করলেও ওয়াশিংটন ও বাগদাদের মধ্যকার নিরাপত্তা সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। সামরিক সহায়তা, অস্ত্র বিক্রি, সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দুই দেশের নতুন দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতার চুক্তি কার্যকর থাকবে।