জাতীয়

গ্রাম ও শহরে বৈষম্য কমাতে ঢাকাতেও লোডশেডিং হবে

গ্রাম ও শহরে বৈষম্য কমাতে ঢাকাতেও লোডশেডিং হবে

স্টাফ রিপোর্টার,

কৃষকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাম ও শহরে বৈষম্য কমাতে সরকার রাজধানীতে পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদের বৈঠকে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।  

এর আগে বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাধারণত এই বিবৃতি দেওয়া হয়। দেশে জ্বালানি সংকট শুরুর পর এই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এটা দ্বিতীয় বিবৃতি। এর আগে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মার্চের পরিস্থিতি তুলে ধরে সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়েছিলেন।    

লোডশেডিংয়ে মানুষের কষ্টের কারণে দুঃখ প্রকাশ করে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখা যাচ্ছে, এখন যে কষ্ট স্বীকার করতে হচ্ছে, এটি আগামী সাত দিনের মধ্যেই কমে যাবে। তিনি জানান, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই উত্তপ্ত গরমে অনেককেই বিদ্যুৎ সমস্যায় নাজেহাল হতে হয়েছে। এই সমস্যা এক দিনের নয়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অব্যবস্থাপনার দায় এখন সবাইকে নিতে হচ্ছে। 

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতা কাগজে-কলমে অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেটির গরমিল রয়েছে। বুধবার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট, এর বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার  ১২৬ দশমিক ৩৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, দুই হাজার ৮৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে বাধ্য হতে হয়েছে। 

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই সরকারের নীতি ছিল, ফসল ওঠার মৌসুমে, অর্থাৎ কোনোভাবেই কৃষকরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, ফসলের ক্ষেত্রে সেচের জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল এবং বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন। সেটি নিশ্চিত করতে সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। 

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে হয়তোবা কিছু কিছু জায়গায় লোডশেডিং হচ্ছে। এই বিষয়টি সহনীয় মাত্রায় আনতে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে এবং বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা করে রাজধানী ঢাকায় প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলক ১১০ মেগাওয়াট  লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শহরের মানুষ আরামে থাকবে আর গ্রামের মানুষ কষ্টে থাকবে, এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ, অর্থাৎ শহর এবং গ্রামের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকতে পারে না। সেই বৈষম্যমুক্ত করার জন্য শহরেও প্রয়োজনে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাতে কৃষকরা তাদের সেচের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পেতে পারেন। 

উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো কেন পরিমিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না– এমন প্রশ্ন উঠতে পারে জানিয়ে  প্রতিমন্ত্রী বলেন,  প্রতিদিন বাংলাদেশে তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে দেশের সব কূপ মিলে প্রতিদিন এক হাজার ৬৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা যায়। গড়ে আমদানি হয় ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, অর্থাৎ প্রতিদিন এক হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুটে গ্যাসের ঘাটতি থাকে। অর্থ ও সামর্থ্য থাকলেও গ্যাসের আমদানি বাড়াবার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এর জন্য যে অবকাঠামো রয়েছে, তা দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব নয়। তার পরও এ অবকাঠামো বাড়ানোর জন্য বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের যে অগ্রাধিকার তালিকা রয়েছে, এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেশবাসী দেখতে সক্ষম হবে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজেদের মেইনটেনেন্সের কারণে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তারা পূর্ণ উৎপাদনে যাবে। সে ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখা গেলেও আগামী সাত দিনের মধ্যেই তা কমে যাবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি দেশবাসীর কাছে আজ এই সংসদে দাঁড়িয়ে তাদের কষ্টের জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বিনয়ের সঙ্গে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি শুধু আশ্বস্ত করতে চাই, জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা রয়েছে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদ আমলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাওয়ায় এখন সরকারের তরফ থেকে কোনো বক্তব্য এলে স্বাভাবিকভাবে সেখানে আস্থা অর্জন করতে দেশবাসীর কিছুটা হলে সময় লাগবে। সরকারের প্রতিটি বক্তব্যের মধ্যে স্বচ্ছতা রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে যে ঘটনাটি কখনও ঘটেনি, তেমন একটি নজির প্রধানমন্ত্রী রাখতে চলেছেন। অর্থাৎ, বর্তমানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। তাঁর পরামর্শও গ্রহণ করা হয়েছে।

সংসদ ভবনেও লোডশেডিং চান বিরোধীদলীয় নেতা  
ঢাকায় লোডশেডিং নিয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া বিবৃতির কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এটা যেন সংসদ থেকে শুরু হয়। লোডশেডিংয়ের আওতায় সংসদও যেন থাকে। যদি ঢাকার অন্য অংশে এক ঘণ্টা থাকে (লোডশেডিং), এখানেও (সংসদে) যেন এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকে। এখান থেকে শুরু হোক, তাহলে জনগণ বুঝবে বাংলাদেশকে আমরা সর্বজনীন হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছি। 

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের নেতার উদ্দেশে বলেন, সংসদ তো চালু রাখতে হবে। সংসদ বন্ধ করা যাবে না। পরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তিনি সংসদ ভবনের কথা বলেছেন, অধিবেশন কক্ষের কথা বলেননি।  অধিবেশন কক্ষের বাইরেও সংসদ ভবনে অনেক কর্মঘণ্টা (কার্যক্রম) আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।