নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশজুড়ে আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। গরমের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, আবার কোথাও দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনে ভোগান্তি বাড়ছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলমান সংকটের অন্যতম কারণ জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি। বিশেষ করে গ্যাসের সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে জাতীয় গ্রিডে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালকে কেন্দ্র করে গ্যাস সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি ধাপে ধাপে স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করা হলেও সংকট পুরোপুরি কাটতে সময় লাগছে। এর মধ্যেই বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ডের কথা উল্লেখ করা হলেও স্থানীয়ভাবে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দেশের অন্য এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ গ্রাহকেরা।
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। দিনের বেলায় গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের কষ্ট বাড়ছে। রাতের বেলায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা, দোকানপাট, ওয়ার্কশপ ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়ছে।
শিল্প খাতেও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়, যন্ত্রপাতি চালানোর সময়সূচি পরিবর্তন করতে হয় এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। গ্যাস সংকটের কারণে একই সঙ্গে শিল্পকারখানার উৎপাদনেও চাপ তৈরি হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড নিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন, চাহিদা ও লোডশেডিংয়ের তথ্য প্রকাশ করে। ৯ আগস্টের দৈনিক উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্যও বোর্ডের আর্কাইভে প্রকাশিত হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে এসব তথ্যের পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক বিতরণ সংস্থার সরবরাহ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে লোডশেডিং পুরোপুরি কমবে কখন, তা নির্ভর করছে জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য কত দ্রুত ফিরিয়ে আনা যায় তার ওপর।