বাণিজ্য

NBFI অবসায়নে কর্মসংস্থান ও আমানতকারীদের অনিশ্চয়তা

NBFI অবসায়নে কর্মসংস্থান ও আমানতকারীদের অনিশ্চয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

দেশের দুর্বল ও দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা কয়েকটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই অবসায়নের উদ্যোগে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালে সমস্যাগ্রস্ত কয়েকটি এনবিএফআই অবসায়ের প্রক্রিয়ায় নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, সুশাসনের ঘাটতি এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার মতো বিষয় রয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়টি এনবিএফআইয়ের অবসায়ন নিয়ে শুনানিও শুরু করেছিল। ওই তালিকায় এফএএস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ছিল।

অবসায়নের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে নিয়মিত কার্যক্রম, শাখা পরিচালনা ও প্রশাসনিক কাজের পরিধি কমে আসে। ফলে চাকরি হারানো, কর্মীদের পাওনা, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ আইনগত পাওনা নিষ্পত্তির প্রশ্ন সামনে আসে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানের কতজন কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং তাদের পাওনা কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা সমীচীন নয়।

অন্যদিকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়টি সমস্যাগ্রস্ত এনবিএফআইয়ে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের অর্থ প্রায় ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আমানত প্রায় ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক পৃথকভাবে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার একটি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়। পাঁচটি এনবিএফআই অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্তের সময় জানানো হয়েছিল, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত থাকা ব্যক্তিগত আমানতকারীরা মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন; তবে ওই ব্যবস্থায় সুদ ফেরত দেওয়ার কথা ছিল না।

তবে অর্থ ফেরতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয়টি সমস্যাগ্রস্ত এনবিএফআইয়ের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঘাটতি অবসায়ন কার্যক্রমে বিলম্বের কারণ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অর্থ ফেরতের সময়সূচি ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন।

অবসায়নের ক্ষেত্রে শুধু প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে দায় পরিশোধ করাই যথেষ্ট নয়; কার পাওনা আগে পরিশোধ হবে, কর্মীদের আইনগত পাওনা কীভাবে নিষ্পত্তি হবে এবং ব্যক্তিগত আমানতকারীরা কখন অর্থ পাবেন—এসব বিষয়েও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামোতে ব্যর্থ আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত, পুনর্গঠন বা বন্ধ করার সুযোগ এবং সম্পদ বিক্রির পর পাওনাদারদের পাওনা পরিশোধের অগ্রাধিকার নির্ধারণের কাঠামো রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আমানতকারীদের অর্থের ঝুঁকি বাড়ানোর চেয়ে নিয়ম মেনে দ্রুত ও স্বচ্ছ অবসায়ন ব্যবস্থা গ্রহণ আর্থিক খাতের শৃঙ্খলার জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র আমানতকারী ও সাধারণ কর্মীদের ওপর যাতে অসম চাপ না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও নিয়ন্ত্রকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের অনিশ্চয়তা যেমন আর্থিক আস্থায় প্রভাব ফেলে, তেমনি হঠাৎ কর্মসংস্থান হারানো পরিবারগুলোর আয় ও সামাজিক নিরাপত্তায় চাপ তৈরি করতে পারে।

এ কারণে এনবিএফআই অবসায়নের সঙ্গে সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের নির্দিষ্ট সময়সূচি, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়ের স্বচ্ছ হিসাব, কর্মীদের আইনগত পাওনা নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নিয়মিত তথ্য প্রকাশ জরুরি হয়ে উঠেছে। এতে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আস্থা বাড়বে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কার্যকারিতাও বাড়বে।