নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
দেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে ডিজিটাল প্রযুক্তি, অনলাইন সেবা, প্রশিক্ষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা বাড়ানোর একাধিক উদ্যোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, বাজারসংক্রান্ত তথ্য ও ব্যবসায়িক পরামর্শ এক জায়গায় পৌঁছে দিতে জাতীয় বিজনেস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস (বিডিএস) পোর্টাল চালু হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়, এসএমই ফাউন্ডেশন ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) উদ্যোগে গত ২৯ জুন এ পোর্টাল চালু করা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অন্যতম সমস্যা হলো ব্যবসার প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা পেতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়া। নতুন পোর্টালটি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, বাজারের সুযোগ এবং ব্যবসায়িক পরামর্শের তথ্য এক জায়গায় দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে। ফলে ছোট ব্যবসার মালিকদের তথ্যপ্রাপ্তির সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক সেবায় প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে।
ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঢাকায় আগামী ১৫ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার মালিকদের জন্য হাতে-কলমে এআই ব্যবহারের কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, কর্মশালায় কোডিং না জেনেও ব্যবসায়িক কাজে এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রয়োগ দেখানো হবে।
এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের এআই জ্ঞান বাড়াতেও বেসরকারি খাতে উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। শিখো, লাইটক্যাসল পার্টনার্স ও মেটার সহযোগিতায় চালু করা ‘থিংক এআই’ নামের বিনামূল্যের বাংলা কোর্সে এআইয়ের মৌলিক ধারণা, জেনারেটিভ এআইয়ের কার্যপ্রণালি, দায়িত্বশীল ব্যবহারের নীতি এবং দক্ষতা উন্নয়নের পথ নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। উদ্যোগটির অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে এআই ও ডিজিটাল দক্ষতা ছড়িয়ে দেওয়া।
সরকারও উপজেলা পর্যায়ে এআই ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। গত মে মাসে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছিলেন, প্রতিটি উপজেলায় এ ধরনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ৫জি সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বাড়িয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ডিজিটাল দক্ষতার গুরুত্ব শুধু অনলাইন বিপণন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিসাব সংরক্ষণ, অনলাইন লেনদেন, গ্রাহকের তথ্য ব্যবস্থাপনা, পণ্য প্রচার, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, অনলাইন বিক্রি এবং তথ্য বিশ্লেষণেও প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যবসার সময় ও পরিচালন ব্যয় কমাতে পারে। গবেষণাতেও বাংলাদেশের এসএমই খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনার পাশাপাশি দক্ষতার ঘাটতি, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষণের অভাব ও সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল পেতে হলে শুধু প্রশিক্ষণ চালু করলেই হবে না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ভাষায় প্রশিক্ষণ, কম খরচে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রশিক্ষণের পর বাস্তব ব্যবসায়িক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা ও প্রত্যন্ত এলাকার ব্যবসায়ীরা যাতে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বাইরে না থাকেন, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি সহায়তা, বেসরকারি উদ্যোগ ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় কার্যকর হলে উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দায়িত্বশীলভাবে এআই ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।