বাণিজ্য

নতুন শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ

নতুন শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং অভিবাসনসেবা সহজ করতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি বাংলাদেশির বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শ্রমবাজার বহুমুখীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, অভিবাসন ব্যয় কমানো, সেবার ডিজিটালাইজেশন এবং প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি আগে বন্ধ বা সীমিত হয়ে যাওয়া বাজারগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। জুলাইয়ের শুরুতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের পর বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়েছে। তবে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ এবং অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে আর্থিক লেনদেন না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মরিশাসের শ্রমবাজারও পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুনে জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং মরিশাসের শ্রমমন্ত্রীর বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। শ্রমবাজারটি পুনরায় চালু হলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শুধু প্রচলিত কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে শ্রমবাজার বহুমুখীকরণের ওপরও জোর দিচ্ছে সরকার। সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বিদেশে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কর্মীদের বিদেশযাত্রার আগে প্রস্তুতি ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতেও মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সেবা রয়েছে। সরকারি সেবা কাঠামোয় বিদেশ যাওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি, স্বল্প ব্যয়ে নিরাপদ অভিবাসন, জীবনবিমা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অভিবাসন ঋণের মতো সহায়তার তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বৈধ ও নিরাপদ পথে কর্মীদের বিদেশে পাঠানো এবং অভিবাসনের প্রাথমিক ব্যয় ও ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করা।

প্রবাসীদের দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নিরসন সেলও গঠন করেছে মন্ত্রণালয়। জুনে এ উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, ছয় মাসের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য রয়েছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির পাশাপাশি প্রবাসীদের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি কমানো এবং জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয়টিও এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।

প্রবাসী সেবা ডিজিটাল করার ক্ষেত্রেও নতুন পরিকল্পনা রয়েছে। জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রবাসী কার্ড চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কার্ডটি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে এবং এতে প্রবাসীদের জন্য ১০টি বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের পরিচয় ও বিভিন্ন সেবা ব্যবস্থাপনা আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেও দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জুনে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশি জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে কাজ করার আশ্বাস দেন। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সঙ্গে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকারের কথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

তবে নতুন কর্মসংস্থানের ঘোষণা বাস্তব সুফলে রূপ দিতে হলে শুধু শ্রমবাজারের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা, নিয়োগ চুক্তির স্বচ্ছতা, কর্মপরিবেশ, বেতন-ভাতা, আবাসন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং দেশে ফেরার পর পুনর্বাসনের বিষয়গুলোও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দালালচক্র ও অননুমোদিত আর্থিক লেনদেন ঠেকাতে সরকারি তথ্য দ্রুত ও সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি।

বিশেষ করে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের আগাম অর্থ লেনদেন না করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা বিদেশগামী কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মী পাঠানোসংক্রান্ত যোগাযোগ বা আর্থিক লেনদেন না করতে মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে। এতে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।

বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতি ও লাখো পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, কম অভিবাসন ব্যয়, কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে সরকারের ঘোষিত কর্মসংস্থান লক্ষ্যের সুফল আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।