বাণিজ্য

সৌদি কারখানায় আগুনে ১৬ বাংলাদেশি নিহত

সৌদি কারখানায় আগুনে ১৬ বাংলাদেশি নিহত

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরের দিকে রিয়াদের মুসা সানাইয়া এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সৌদি ফায়ার সার্ভিসের তথ্যের ভিত্তিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ১৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। তবে মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, ওই কারখানায় বাংলাদেশি শ্রমিকেরা কাজ করতেন। বিভিন্ন স্থানীয় ও প্রবাসী সূত্রে নিহতদের মধ্যে নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর বাসিন্দাদের থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নওগাঁর আত্রাই উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিহতদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশ সরকারের উদ্ধৃত সৌদি ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে এ ঘটনায় ১৬ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়ে দূতাবাস পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

ঘটনাটি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সৌদি আরবের শ্রম আইনে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষা, নিরাপত্তাবিধি, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়োগকর্তার ওপর রয়েছে। আইনে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সচল নিরাপদ বহির্গমনপথ রাখার বাধ্যবাধকতার কথাও উল্লেখ আছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাও অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তাবিধি সম্পর্কে সহজবোধ্য তথ্য এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সৌদি আরবে পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা জোরদারে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইএলও কাজ করছে।

সৌদি আরব বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে দেশটিতে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বড় একটি অংশ তুলনামূলক কম দক্ষতার কাজে নিয়োজিত এবং গত বছর বাংলাদেশি শ্রমিকেরা সৌদি আরব থেকে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। ফলে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা শুধু ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় নয়, দেশের অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

রিয়াদের এ অগ্নিকাণ্ড তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার তদন্তে সীমাবদ্ধ না রেখে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিয়োগের আগে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই, কর্মস্থলে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, আবাসন ও কর্মপরিবেশ নিয়মিত তদারকির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, কারখানাটিতে নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না এবং নিহতদের পরিবার আইন অনুযায়ী কী ধরনের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী—এসব বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।