জাতীয়

‘মিনিস্ট্রি অডিটে’ ঘুষের রেট এক মাসের বেতন

‘মিনিস্ট্রি অডিটে’ ঘুষের রেট এক মাসের বেতন

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক, প্রশাসনিক ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম শনাক্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ)। কিন্তু এই তদারকি ব্যবস্থার আড়ালেই ঘুষ আদায়ের একটি চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘মিনিস্ট্রি অডিট’ নামে পরিচিত ডিআইএর পরিদর্শন ও নিরীক্ষার সময় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দাবি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রায় ৭০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে ৭ লাখ টাকা করে নেওয়া হলে মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি। তবে এই হিসাবকে চূড়ান্ত বা প্রমাণিত ঘুষের পরিমাণ হিসেবে না দেখে অভিযোগ ও সূত্রভিত্তিক হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ডিআইএ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি তদারকি সংস্থা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থের ব্যবহার, এমপিও-সংক্রান্ত বিষয়, শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ, জাল সনদ, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা যাচাই করা এর অন্যতম দায়িত্ব। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে প্রায় ৩৬ হাজার ৭০০ থেকে ৩৭ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর এই তদারকি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে ৯৭৩টি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় প্রায় ৮৯ কোটি ৮২ লাখ ২৫ হাজার ৬০৭ টাকার আর্থিক অনিয়ম, ১৭৬ দশমিক ৫২৩ একর সরকারি জমি বেহাত এবং জাল সনদ ও অবৈধ নিয়োগের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে ডিআইএ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে, যে সংস্থার কাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত করা, সেই সংস্থারই কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অডিটকে কেন্দ্র করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ কীভাবে তৈরি হলো। ২০২৫ সালের নভেম্বরের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ডিআইএর অন্তত ১৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘিরে ঘুষের একটি সিন্ডিকেটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই প্রতিবেদনে পরিদর্শন ও নিরীক্ষার সময় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি কোথাও দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দাবি করার তথ্যও প্রকাশ করা হয়।

অভিযোগের ধরন বোঝাতে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার পশ্চিম নওমালা ফাজিল মাদ্রাসার একটি ঘটনা সামনে আসে। প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে অডিটে যাওয়ার পর কর্মরত ৩০ জনের এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। প্রথম দফায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার একটি অডিও রেকর্ড থাকার দাবিও করা হয়। একই ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষক অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ঘুষ দেওয়ার জন্য তিনি কোনো টাকা তোলেননি এবং শিক্ষকদের অর্থ দিতে চাপও দেননি।

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে অডিট প্রতিবেদনে অনুকূল ফল দেওয়ার আশ্বাসে সাতজন শিক্ষকের কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের সঙ্গে অডিও রেকর্ড দেওয়ার কথাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা এ অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বা অর্থ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। ফলে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অডিও, আর্থিক লেনদেনের নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফলই চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়েও অডিটের সময় এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অডিট কর্মকর্তারা প্রথমে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করার কথা জানিয়ে পরে অডিট প্রতিবেদন নিয়ে ভয় বা অনিশ্চয়তা তৈরি করতেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীরা চাকরি, বেতন ও ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কায় অর্থ দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

এই অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘মিনিস্ট্রি অডিট’ নামটির ব্যবহার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিআইএর নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অনেক ক্ষেত্রে এই নামে পরিচিত। প্রকাশিত অনুসন্ধানগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে, অডিটের সময় শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও চাকরি নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সম্ভাব্য শাস্তি বা বেতন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখানো এবং পরে অর্থের বিনিময়ে সমস্যা এড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের মাত্রা বোঝাতে ২০২২ সালের একটি পুরোনো ঘটনাও সামনে আসে। যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্তত ২০০ শিক্ষক-কর্মচারীর এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ‘মিনিস্ট্রি অডিটের’ নামে নেওয়ার অভিযোগ তখন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই ঘটনায় চাকরি ও অবসরকালীন সুবিধা নিয়ে জটিলতার ভয় দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়। অর্থাৎ সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ কেন ফিরে আসছে, সেটিও তদন্তের বিষয়।

তবে ডিআইএর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির অডিট কার্যক্রমে অনিয়ম উদ্ঘাটনের ভূমিকাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের শেষ ছয় মাসের অডিটে প্রায় ৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে জাল সনদে নিয়োগ, অবৈধ নিয়োগ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং সরকারি জমি বেহাতের মতো বিষয় রয়েছে। ডিআইএ এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘুষের অভিযোগ প্রকাশের পর বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্তের পর্যায়েও গড়ায়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগের পর ডিআইএ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনও আলাদাভাবে অনুসন্ধান শুরু করে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কয়েকজন কর্মকর্তাকে দপ্তর থেকে সরিয়ে দেয় বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর পরও প্রশ্ন থেকে যায়—একটি অডিট ব্যবস্থা কীভাবে এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যেখানে অডিটের ভয়ই অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হয়ে ওঠার অভিযোগ তৈরি হয়। সরকারি অর্থের অপচয়, জাল সনদ, অবৈধ নিয়োগ কিংবা আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত করার জন্য যে পরিদর্শন ব্যবস্থা, সেখানে ঘুষের অভিযোগ উঠলে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অডিটের পুরো প্রক্রিয়াকে নথিভুক্ত, পর্যবেক্ষণযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক করাও জরুরি।

ডিআইএর বর্তমান কর্তৃপক্ষ অডিট প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে। পরিদর্শন শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, প্রতিবেদনের শুরুতেই বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও অডিট আপত্তির সারসংক্ষেপ প্রকাশ এবং পরিদর্শন চলাকালে অনিয়মের তথ্য লিখিতভাবে জানানোর মতো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে মাঠপর্যায়ের অডিট ও পরবর্তী প্রতিবেদনের মধ্যে অনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ কমতে পারে।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে অডিট কর্মকর্তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক যোগাযোগের স্বচ্ছতা। অডিটের নামে কোনো অর্থ দাবি করা হলে তা ব্যক্তিগতভাবে না দিয়ে লিখিত রসিদ, সরকারি চালান বা নির্ধারিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে কোনো লেনদেন না করার নীতি কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগকারী শিক্ষক বা কর্মচারীর চাকরি ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অনিয়মের তথ্য সামনে আসা কঠিন। ফলে অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি অভিযোগকারীর সুরক্ষাও জবাবদিহির অংশ হওয়া উচিত।

সবচেয়ে বড় কথা, অডিটের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। সেখানে এক মাসের বেতন বা তারও বেশি অর্থ ঘুষ হিসেবে দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি কাঠামোর ওপর গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। প্রায় ৭০০ প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে ৭ লাখ টাকা করে প্রায় ৫০ কোটি টাকার লেনদেনের যে হিসাব অভিযোগ হিসেবে সামনে এসেছে, তার পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত, আর্থিক নথি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন অভিযোগ বন্ধে কাঠামোগত সংস্কারই হতে পারে এই সংকটের টেকসই সমাধান।