লাইফ স্টাইল

দেশে হামের উপসর্গে আরও চার শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ছাড়ালো ৮৯৪: জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ

দেশে হামের উপসর্গে আরও চার শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ছাড়ালো ৮৯৪: জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত এক হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই নতুন মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ মৃত শিশুদের কারও হাম শনাক্ত না হলেও তাদের উপসর্গ ছিল মারাত্মক। একই সময়ে, দেশে আরও ৯৭২ শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে মোট ৭৯৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে, ৯৯ শিশুর ক্ষেত্রে হাম শনাক্তের পর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, এই সময়ের মধ্যে মোট ৮৯৪ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে এবং হাম প্রতিরোধের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। যদিও সব মৃত্যুর কারণ সরাসরি হাম হিসাবে নিশ্চিত করা হয়নি, তবে উপসর্গের তীব্রতা এবং ব্যাপকতা পরিস্থিতিকে গুরুতর করে তুলেছে।

হাম কী এবং কেন এটি এত বিপজ্জনক? হাম (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ যা রুবেলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে নির্গত ড্রপলেটের মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। হাম সাধারণত ছোট শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সের মানুষই এতে আক্রান্ত হতে পারে। এর জটিলতা মারাত্মক হতে পারে, যেমন নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ), অন্ধত্ব এবং এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য হাম অত্যন্ত প্রাণঘাতী।

হামের লক্ষণ ও উপসর্গ: হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং গলায় ব্যথা। এর কয়েকদিন পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা যায়, যা মুখমণ্ডল থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় মুখে কোপলিক স্পট (Koplik's spots) নামে ছোট সাদা দাগও দেখা যায়। এই উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা: হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হলো টিকাদান। এমএমআর (Measles, Mumps, Rubella) টিকা হাম, মাম্পস এবং রুবেলা এই তিনটি রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। শিশুদের সঠিক সময়ে এই টিকা প্রদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো টিকাদান কর্মসূচির পরিধি বাড়াতে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। আক্রান্ত শিশুদের বিচ্ছিন্ন রাখা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করাও জরুরি। এছাড়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ঘন ঘন হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক।

বর্তমান পরিস্থিতি এবং করণীয়: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু এবং আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। টিকাদান কর্মসূচিতে যেন কোনো শিশু বাদ না পড়ে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং হামের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ জনগণ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।