নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে জাহাজ ভাঙার সময় স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাংক থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার দিকে ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিকেলে নিহতের সংখ্যা ৯ জনে পৌঁছানোর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস।
ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে একটি পুরোনো এলএনজি জাহাজ ভাঙার কাজ চলছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজটির একটি বদ্ধ ট্যাংক বা কক্ষে কয়েকজন প্রবেশ করার পর বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে আক্রান্ত হন। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে চিকিৎসাধীন কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
তবে দুর্ঘটনার প্রকৃতি নিয়ে প্রাথমিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেখানে বিস্ফোরণ ঘটেনি; বরং জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস লিক হয়ে বিষক্রিয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ প্রথম দিকে জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণের কথা বলেছিলেন। ফলে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজটি স্ক্র্যাপ হিসেবে আনা পুরোনো এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ। জাহাজ ভাঙার আগে ভেতরের ট্যাংক ও বদ্ধ অংশে থাকা অবশিষ্ট গ্যাস বা বিপজ্জনক পদার্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ করা হয়েছিল কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, জাহাজটি ভাঙার আগে যথাযথভাবে পরিষ্কার না করায় ভেতরে কার্বন মনোক্সাইড আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
শুক্রবার সকালেই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। আহত ও অসুস্থ ব্যক্তিদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুপুরের পরও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্যে নিহতের সংখ্যা আটজন থেকে নয়জনে পৌঁছানোর কথা জানা যায়। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের কয়েকজন শ্রমিক হলেও স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় লোকজনও আক্রান্ত হন। ফলে শিপইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু কর্মরত শ্রমিকদের জন্য নয়, আশপাশের সাধারণ মানুষের জন্যও যথেষ্ট ছিল কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার সময় ইয়ার্ডটি নিয়মিত কার্যক্রমে চালু ছিল কি না, তা নিয়েও ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফের দাবি, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টার দিকে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে লিকেজ দেখা দেওয়ার পর স্থানীয় লোকজন বিষয়টি দেখতে গেলে গ্যাসে আক্রান্ত হন। অন্যদিকে বিভিন্ন সূত্রে জাহাজ ভাঙার কাজ চলার সময় শ্রমিকেরা বদ্ধ অংশে প্রবেশ করেছিলেন বলে জানানো হয়েছে। এই পার্থক্যও তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার পর কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেছেন। দুর্ঘটনার কারণ এবং জাহাজ ভাঙার আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও গ্যাসমুক্তকরণ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এ খাতে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। জাহাজ ভাঙার সময় দাহ্য বা বিষাক্ত গ্যাস, বদ্ধ স্থানে অক্সিজেনের ঘাটতি, ভারী ধাতু এবং অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে পুরোনো জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক, পাইপলাইন ও বদ্ধ স্থান নিরাপদ করা এবং গ্যাস পরীক্ষা করা না হলে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান উন্নয়নের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জুলাইয়ে সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড পরিদর্শন করে শিল্পমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এ শিল্প পরিচালনা এবং গ্রিন লাইসেন্স নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
একই শিল্প এলাকায় এর আগেও গ্যাস ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতাহতের নজির রয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরা এলাকায় একটি স্ক্র্যাপের দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একজন নিহত ও তিনজন আহত হন।
শুক্রবারের ঘটনাটি তাই কেবল একটি শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জাহাজ ভাঙার আগে গ্যাসমুক্তকরণ, বদ্ধ স্থানে প্রবেশের অনুমতি, অক্সিজেন ও বিষাক্ত গ্যাস পরীক্ষা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি—এসব ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর ছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বের করা প্রয়োজন।
নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সহায়তা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। তবে নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শিপইয়ার্ডগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোরভাবে তদারক করা প্রয়োজন।