একটি চারা মাটিতে পুঁতে ছবি তোলা খুব সহজ। কঠিন হলো সেই চারাটিকে কয়েক বছর পর একটি ছায়াদানকারী, পরিবেশবান্ধব ও জীবন্ত বৃক্ষে পরিণত করা। বাংলাদেশে প্রতি বছর বর্ষা এলেই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন হয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা আসলে কতটি গাছ লাগাই, আর কতটি গাছ শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে?
২০২৬ সালে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। পরিকল্পনায় খাসজমি, চরাঞ্চল, নদীর তীর, সড়ক ও মহাসড়কের দুই পাশ, বনাঞ্চল এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জায়গায় গাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছে। শিক্ষার্থীদেরও একটি করে গাছ লাগিয়ে পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি নিঃসন্দেহে বড় উদ্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ, জীববৈচিত্র্যের সংকট এবং দ্রুত নগরায়ণের বাস্তবতায় বাংলাদেশে বৃক্ষ ও সবুজ এলাকার পরিমাণ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বড় সংখ্যার লক্ষ্য ঘোষণা করাই সাফল্যের শেষ কথা নয়। ২৫ কোটি চারা যদি রোপণের পর পর্যাপ্ত পরিচর্যা না পায়, ভুল প্রজাতি ভুল জায়গায় লাগানো হয় কিংবা কয়েক বছর পর সেগুলোর কোনো হিসাব না থাকে, তাহলে সেই বিপুল কর্মসূচি কাগজে বড় হলেও পরিবেশের জন্য প্রত্যাশিত ফল দেবে না।
সাম্প্রতিক সময়ের একটি ইতিবাচক দিক হলো, বৃক্ষরোপণকে এখন কেবল বনাঞ্চলের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরেও নগর সবুজায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ঈদুল আজহার পর তেজগাঁও পলিটেকনিক খেলার মাঠ ও সংলগ্ন সড়ক বিভাজকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করেছে।
ঢাকার বাস্তবতা আমাদের চোখের সামনে। একদিকে বাড়ছে ভবন, সড়ক, যানবাহন ও মানুষের চাপ; অন্যদিকে খোলা জায়গা, জলাধার ও সবুজ এলাকার ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে নগর পরিকল্পনায় গাছকে সৌন্দর্যবর্ধক উপাদান হিসেবে দেখার পুরোনো ধারণা বদলাতে হবে। গাছ শুধু রাস্তার পাশে লাগানোর জন্য নয়; এটি শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ছায়া সৃষ্টি, বায়ুর মান উন্নত করা, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও ঢাকার নগর তাপদ্বীপ বা আরবান হিট আইল্যান্ড প্রভাব মোকাবিলায় পার্ক, ছাদবাগান, উল্লম্ব সবুজায়ন এবং জলাধারের মতো সবুজ ও নীল অবকাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ শহরের তাপমাত্রা কমাতে শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বাড়ানো নয়, প্রকৃতির নিজস্ব শীতলীকরণ ব্যবস্থাকেও পরিকল্পনার অংশ করা প্রয়োজন।
বায়ুদূষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দূষিত ১০টি শহরের নয়টিই এই অঞ্চলে এবং ঢাকাও সেই তালিকায় রয়েছে। বায়ুদূষণ বাংলাদেশে অকালমৃত্যুর বড় কারণগুলোর একটি বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
তবে এখানেও একটি ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গাছ লাগালেই বায়ুদূষণের সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, ইটভাটা, শিল্পকারখানার নির্গমন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কমাতে হবে। গাছ হবে সেই বৃহত্তর পরিবেশ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, একমাত্র সমাধান নয়।
নগর সবুজায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো ‘যেখানে জায়গা আছে, সেখানে গাছ লাগাও’ নীতি। শহরের প্রতিটি জায়গার জন্য একই গাছ উপযুক্ত নয়। রাস্তার মাঝের বিভাজক, ফুটপাত, পার্ক, খেলার মাঠ, জলাধারের পাড়, আবাসিক এলাকা কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের চত্বর—প্রতিটি স্থানের পরিবেশগত ও ব্যবহারিক প্রয়োজন আলাদা।
একটি বড় গাছের শিকড় ফুটপাত বা সড়কের ক্ষতি করতে পারে, আবার অত্যন্ত ঘন বৃক্ষরোপণ পথচারীর চলাচল কিংবা বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে এমন জায়গায় গাছ লাগানো উচিত নয় যেখানে ভবিষ্যতে সড়ক সম্প্রসারণ বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের কারণে গাছ কেটে ফেলতে হবে। তাই বৃক্ষরোপণের আগে স্থানভিত্তিক পরিকল্পনা জরুরি।
প্রজাতি নির্বাচনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি, পানি, জলবায়ু ও প্রতিবেশ আলাদা। উপকূলীয় এলাকায় যে গাছ উপযোগী, পাহাড়ি এলাকায় সেটি নাও হতে পারে। শহরের ফুটপাতের জন্য যে প্রজাতি উপযুক্ত, নদীর তীরের জন্য তা নাও হতে পারে। দেশীয় ও স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ফলদ, বনজ, ঔষধি ও ছায়াদানকারী গাছের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে তাই ‘কতটি চারা লাগানো হলো’—এই সূচকের পাশাপাশি ‘কতটি গাছ বেঁচে আছে’—এই সূচক চালু করা জরুরি। একটি কর্মসূচির সাফল্য এক বছর পর নয়, তিন বছর, পাঁচ বছর কিংবা দশ বছর পর মাপা উচিত। চারা লাগানোর ছবি দিয়ে প্রকল্পের সাফল্য প্রমাণ করা যাবে না; গাছের বেঁচে থাকার হারই হতে হবে মূল হিসাব।
এক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি বড় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির স্থান, প্রজাতি, রোপণের তারিখ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পর স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন বা মাঠপর্যায়ের যাচাইয়ের মাধ্যমে গাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এতে ‘কাগজে গাছ, মাঠে নেই’ ধরনের প্রবণতা কমানো যাবে।
২০২৬ সালের জাতীয় কর্মসূচিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকেও যুক্ত করা হয়েছে। ১৫ জুলাই দেশব্যাপী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় দুই লাখ চারা একসঙ্গে রোপণ করা হয়েছে। শিশুদের বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় মূল্য শুধু দুই লাখ চারা নয়; বরং শিশুদের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। একটি শিশু যদি নিজের হাতে লাগানো গাছটির দায়িত্ব নেয়, তার মধ্যে প্রকৃতি সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা তৈরি হতে পারে। তবে এখানেও একটি প্রশ্ন—বিদ্যালয়ে গাছ লাগানোর পর কে পানি দেবে, কে বেড়া দেবে, কে গাছের পরিচর্যা করবে? শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাদের ওপর পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও অভিভাবকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবিও ২০২৬ সালে পৃথক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করেছে। সেনাবাহিনীর কর্মসূচি সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলার কথা এবং বিভিন্ন সেনানিবাস, ডিওএইচএস ও জলসিঁড়ি আবাসন এলাকায় ফলদ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধক গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিজিবি ২০২৬ সালে দেশজুড়ে ৭৩ হাজার চারা লাগানোর লক্ষ্য জানিয়েছে।
এ ধরনের বহুমুখী উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন সমন্বয়। একটি এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে গাছ লাগালে একই জায়গায় অতিরিক্ত গাছ লাগানো এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বাদ পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত মানচিত্র ও তথ্যভাণ্ডার থাকলে কোন এলাকায় কতটি গাছ প্রয়োজন, কোন প্রজাতি লাগানো হয়েছে এবং কোথায় পরিচর্যা প্রয়োজন—এসব তথ্য জানা সম্ভব হবে।
নগর সবুজায়নে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ বছরে তিন লাখ গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। রাস্তার বিভাজক ও মিডিয়ানে সবুজায়নের জন্য ‘জিরো সয়েল’ প্রকল্পের কথাও সামনে এসেছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো—আমরা কি শুধু গাছের সংখ্যা বাড়াতে চাই, নাকি একটি বাসযোগ্য শহর তৈরি করতে চাই? যদি লক্ষ্য দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে নগর সবুজায়নের সঙ্গে ফুটপাত, পার্ক, খেলার মাঠ, জলাধার, সাইকেলপথ, পথচারী চলাচল ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পরিকল্পনাকেও যুক্ত করতে হবে।
শহরের একটি পার্ককে শুধু গাছের জায়গা হিসেবে দেখলে হবে না। সেখানে শিশুদের খেলার জায়গা, বয়স্কদের হাঁটার পথ, বসার স্থান, নিরাপদ আলো, পানি নিষ্কাশন এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য উপযোগী পরিবেশ থাকতে হবে। একইভাবে রাস্তার পাশে গাছ লাগানোর অর্থ শুধু সারি সারি চারা বসানো নয়; পথচারী যেন ছায়ার নিচে নিরাপদে হাঁটতে পারেন, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
নগর সবুজায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে ছাদবাগান। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে জমির সংকট থাকায় ভবনের ছাদকে আংশিক সবুজ করা সম্ভব। এতে স্থানীয়ভাবে তাপমাত্রা কমাতে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে এবং নগরবাসীর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক বাড়াতে ভূমিকা রাখা যায়। তবে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, পানি নিষ্কাশন ও অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু সরকারি জমিতে গাছ লাগালে চলবে না। আবাসিক ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার, শপিং কমপ্লেক্স এবং বেসরকারি অফিসগুলোকে নগর সবুজায়নের অংশীদার করতে হবে। একটি ভবনের সামনে কয়েকটি গাছ লাগানো যেমন পরিবেশগত দায়িত্ব, তেমনি নির্মাণের সময় বিদ্যমান বড় গাছ রক্ষা করাও দায়িত্ব।
বরং নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদনের সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ সবুজ জায়গা রাখার বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা যেতে পারে। কোথাও বড় গাছ কাটার প্রয়োজন হলে কেবল সমসংখ্যক চারা লাগানোর শর্ত যথেষ্ট নয়; বড় গাছের পরিবেশগত মূল্য বিবেচনা করে প্রতিস্থাপন, ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে ‘একটি গাছ কাটলে ১০টি চারা’ ধরনের প্রচলিত ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে হবে। দশটি ছোট চারার পরিবেশগত অবদান একটি ৩০ বা ৪০ বছরের পুরোনো বড় গাছের সমান নয়। বড় গাছ ছায়া দেয়, কার্বন ধরে, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাস তৈরি করে এবং নগর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তাই পুরোনো গাছ সংরক্ষণকে নতুন গাছ লাগানোর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
নগর সবুজায়ন শুধু সৌন্দর্যের প্রকল্পও নয়। এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত। তীব্র গরমে শহরের মানুষের কর্মক্ষমতা কমে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রাজনিত স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় নগর সবুজ স্থান তৈরিকে অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তাই পরিবেশবান্ধব শহর মানে শুধু সুন্দর শহর নয়; এটি তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা, স্বাস্থ্যকর, হাঁটাচলার উপযোগী ও মানুষের জন্য সহনীয় শহর।
তবে বৃক্ষরোপণের সঙ্গে জলাধার ও খাল সংরক্ষণকেও একই পরিকল্পনায় আনতে হবে। ঢাকা ও আশপাশের জলাশয় দ্রুত নগরায়ণের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাংক ঢাকার পানি দূষণ কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নদী-খালের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে ৩৭ কোটি ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে।
এ থেকে পরিষ্কার—সবুজ শহর শুধু গাছের শহর নয়; এটি গাছ, জলাধার, খোলা জায়গা, জীববৈচিত্র্য, পরিচ্ছন্ন বায়ু ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বিত শহর।
আমাদের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আরেকটি দুর্বলতা হলো মৌসুমি আবেগ। বর্ষাকালে সবাই চারা লাগায়, ছবি তোলে, সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর শুষ্ক মৌসুম এলে অনেক চারাই পানি ও পরিচর্যার অভাবে মারা যায়। এই চক্র ভাঙতে হলে বৃক্ষরোপণকে এক দিনের অনুষ্ঠান থেকে পাঁচ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে।
যে প্রতিষ্ঠান গাছ লাগাবে, তার ওপর অন্তত কয়েক বছরের পরিচর্যার দায়িত্ব থাকতে হবে। নার্সারি থেকে চারা কেনার ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। রোগাক্রান্ত, দুর্বল বা অনুপযোগী চারা দিয়ে সংখ্যার লক্ষ্য পূরণ করা হলে তা পরিবেশের সঙ্গে প্রতারণা হবে।
একইভাবে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। একটি রাস্তার পাশে গাছ লাগানোর পর স্থানীয় দোকানি, বাসিন্দা, শিক্ষার্থী কিংবা পথচারীরা যদি গাছগুলোকে নিজেদের সম্পদ মনে করেন, তাহলে সেগুলো রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। নগর সবুজায়নকে সরকারি প্রকল্প না বানিয়ে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।
আমাদের আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—সবুজায়ন মানে শুধু গাছ নয়, জীববৈচিত্র্যও। একই ধরনের কয়েক হাজার গাছের সারি দেখতে সুন্দর হতে পারে, কিন্তু পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য স্থানীয় বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদসমষ্টি বেশি কার্যকর। তাই নগর বৃক্ষরোপণে দেশীয় প্রজাতি, ফুল ও ফলধারী গাছ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উপযোগী উদ্ভিদের সমন্বয় দরকার।
জাতীয় পর্যায়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা তাই বাংলাদেশের জন্য বড় পরিবেশগত সুযোগ। কিন্তু এটি যেন ‘চারা লাগানোর প্রতিযোগিতা’ না হয়ে ‘সবুজ বাঁচানোর কর্মসূচি’ হয়। পরিকল্পনায় রোপণের পাশাপাশি পরিচর্যা, বেঁচে থাকার হার, প্রজাতির উপযোগিতা, স্থান নির্বাচন এবং পরিবেশগত ফলাফলকে বাধ্যতামূলক সূচক করতে হবে।
সরকারের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেনাবাহিনী, বিজিবি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের কাজের মধ্যে সমন্বয় দরকার। একটি জাতীয় ড্যাশবোর্ডে প্রতিটি বৃক্ষরোপণ এলাকার তথ্য থাকলে জনগণও দেখতে পারবেন কোথায় কত গাছ লাগানো হয়েছে এবং কতটি বেঁচে আছে।
আমার দৃষ্টিতে আগামী দিনের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির স্লোগান হওয়া উচিত—‘একটি চারা, একটি দায়িত্ব’। কারণ চারা লাগানোর মুহূর্তটি দায়িত্বের শুরু, শেষ নয়।
একটি শিশুর হাতে লাগানো নিমগাছ যদি দশ বছর পর বিদ্যালয়ের মাঠে ছায়া দেয়, একটি রাস্তার পাশে লাগানো বট বা কৃষ্ণচূড়া যদি বহু বছর পর পথচারীকে ছায়া দেয়, একটি খালের পাড়ের স্থানীয় বৃক্ষরাজি যদি পাখি ও কীটপতঙ্গের আবাস তৈরি করে—তখনই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য দৃশ্যমান হবে।
বাংলাদেশের নগরগুলোকে কংক্রিটের মরুভূমিতে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু উন্নয়নের অর্থ প্রকৃতি নিশ্চিহ্ন করা নয়। সড়ক হবে, ভবন হবে, শিল্প হবে, আবাসন হবে—কিন্তু তার সঙ্গে গাছ, জলাধার, খোলা জায়গা ও জীববৈচিত্র্যের জায়গাও থাকতে হবে।
বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরে এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত—নতুন ভবন কোথায় হবে, তার পাশাপাশি কোথায় গাছ থাকবে; নতুন রাস্তা কোথায় হবে, তার পাশাপাশি কোথায় মানুষ হাঁটবে; নতুন আবাসন কোথায় হবে, তার পাশাপাশি কোথায় শিশুরা খেলবে এবং কোথায় বৃষ্টির পানি জমা হবে।
পরিবেশকে উন্নয়নের বিপরীত শক্তি হিসেবে দেখার সময় শেষ। পরিবেশ রক্ষা করেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। একটি গাছ হয়তো আজকের অর্থনীতিতে কোনো দৃশ্যমান আয় তৈরি করে না, কিন্তু তার ছায়া, অক্সিজেন, কার্বন ধারণ, মাটির সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মূল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বহন করবে।
তাই গাছ লাগানোর কর্মসূচি অবশ্যই হোক—আরও বড় পরিসরে হোক। কিন্তু একই সঙ্গে গাছ কাটার বিরুদ্ধে কঠোরতা, পুরোনো গাছের সুরক্ষা, জলাধার রক্ষা, খোলা জায়গা সংরক্ষণ এবং নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগও নিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত একটি দেশের সবুজায়ন কতটি চারা রোপণ হয়েছে, সেই সংখ্যায় মাপা উচিত নয়। মাপতে হবে কতটি গাছ বড় হয়েছে, কতটি নগরবাসী ছায়া পেয়েছে, কতটি পাখি ফিরে এসেছে, শহরের তাপমাত্রা ও বায়ুর মানে কতটা পরিবর্তন এসেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা বাসযোগ্য পরিবেশ রেখে যাওয়া গেল।
গাছ লাগানো একটি অনুষ্ঠান হতে পারে; কিন্তু সবুজ বাঁচানো একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। আমাদের এখন সেই দায়িত্বের দ্বিতীয় ধাপে যেতে হবে—চারা থেকে বৃক্ষ, বৃক্ষ থেকে বন, আর বন থেকে একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ।
লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা, ঢাকা, বাংলাদেশ।