জাতীয়

শপথ নিলেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

শপথ নিলেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

নিজস্ব প্রতিবেদক:


বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হলেন তিনি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাকে রাষ্ট্রপতির শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যসহ কয়েকশ অতিথি উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। শপথ গ্রহণের পর নির্ধারিত শপথনামায় স্বাক্ষর করেন নতুন রাষ্ট্রপতি। পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ ফুল দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।
এর মধ্য দিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের দায়িত্ব নিলেন মির্জা ফখরুল। এর আগে ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার প্রায় চার সপ্তাহ পর নতুন রাষ্ট্রপ্রধান পেল বাংলাদেশ।
২৫৫ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর একাধিক প্রার্থী নিয়ে অনুষ্ঠিত এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা সরাসরি ভোট দেন। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। ভোট শেষে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন।
শপথ অনুষ্ঠানে নতুন দায়িত্বের আনুষ্ঠানিকতা
শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বঙ্গভবনে পৌঁছান মির্জা ফখরুল। পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকারকে সঙ্গে নিয়ে দরবার হলে প্রবেশ করেন তিনি।
জাতীয় সংগীত ও কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শপথ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ শেষে শপথনামায় স্বাক্ষর করেন মির্জা ফখরুল এবং তা সত্যায়িত করেন স্পিকার।
রাষ্ট্রপতির শপথের পর চারজন নতুন মন্ত্রী ও দুইজন প্রতিমন্ত্রীও শপথ নেন। তাদের শপথ পড়ান নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা
শপথ অনুষ্ঠানে প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।
এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নৌবাহিনী প্রধান খোন্দকার মিজবাহ উল আজীমও শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
মির্জা ফখরুলের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহসহ নিকটাত্মীয়রা উপস্থিত ছিলেন।
তৃণমূলের রাজনীতি থেকে বঙ্গভবন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘদিনের। ছাত্রজীবনে বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ। পরে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরিতে যুক্ত হলেও শেষ পর্যন্ত রাজনীতিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হওয়ার পর দলের জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে তার উত্থান শুরু হয়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন শেষে ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও রাজপথের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল। দলের শীর্ষ দুই নেতা দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে বা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকায় মাঠের রাজনীতিতে বিএনপির নেতৃত্বে তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনের সময় একাধিক মামলার মুখোমুখি হন এবং কয়েক দফা কারাগারেও যেতে হয় তাকে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কারণে বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব হিসেবে পরিচিতি পান।
শিক্ষকতা থেকে মন্ত্রিত্ব, এবার রাষ্ট্রপতি
অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালের দিকে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। এরপর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে যুক্ত হন।
২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের কৃষি ও বিমান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায় পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর শপথের মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনে শুরু হলো রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন অধ্যায়।