নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের কাছে রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।
তিন দশকের বেশি সময় পর বহুদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবারের ভোট ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম একাধিক প্রার্থীকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সংসদে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট চলে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। এর মধ্যে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি।
দুপুরে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটের নিয়ম ও নির্দেশনা তুলে ধরার পর সংসদ সদস্যরা ভোট দেন। ভোটগ্রহণ শেষে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
তারেক রহমানের অভিনন্দন
ফল ঘোষণার পরপরই নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। সংসদে মির্জা ফখরুলের হাতে লাল গোলাপ তুলে দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দেশ-বিদেশ থেকে মির্জা ফখরুলের প্রতি অভিনন্দন আসতে থাকে। চীনা দূতাবাস, গণফোরামের এমিরেটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেন, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং পরাজিত প্রার্থী অলি আহমদও তাকে অভিনন্দন জানান।
অলি আহমদ নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়ে বিভিন্ন প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
তৃণমূল থেকে বঙ্গভবনের পথে
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে এসেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা এই রাজনীতিক পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছাড়ার পর পুরোপুরি রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসেন।
১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। পরে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর টানা সেই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি।
আন্দোলনের মাঠে দলের প্রধান মুখ
বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক অনুপস্থিতির বিভিন্ন সময়ে মাঠের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনে তাকে নিয়মিত সামনের সারিতে দেখা গেছে।
রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেছেন তিনি। মামলা, রাজনৈতিক চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কারণে বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি দলের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পান।
শিক্ষকতা থেকে মন্ত্রিসভায়
মির্জা ফখরুলের কর্মজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে সরকারি কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের কৃষি ও বিমান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে জয়ী হয়ে নতুন সরকারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন মির্জা ফখরুল। এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে তিনি।
ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি
রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের হাতেখড়ি ছাত্রজীবনেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় তিনি বামপন্থি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের ছাত্রনেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে পথচলা শুরু হয় তার। শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা শেষে তিনি পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন।
রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থাকলেও নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ তৈরি করেছেন মির্জা ফখরুল। স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় পর্যায়—প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে তিনি বিএনপির মহাসচিব এবং এখন দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
বঙ্গভবনের নতুন অধ্যায়
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর এবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। শুক্রবার শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবনের দায়িত্ব গ্রহণ করলে দেশের সাংবিধানিক রাজনীতিতে তার দীর্ঘ পথচলায় যুক্ত হবে নতুন এক অধ্যায়।
জাতীয়