বাণিজ্য

রেকর্ড লোকসানে ব্যাংক খাত, বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন সংকট

রেকর্ড লোকসানে ব্যাংক খাত, বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক:


দেশের ব্যাংক খাত নজিরবিহীন আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি, অন্যদিকে কমছে ব্যাংকের আয়। ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় একের পর এক তথ্য সামনে আসায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের মানও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে মূলধনে। ফলে দীর্ঘদিন পর সামগ্রিকভাবে লোকসানের মুখে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত।


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০-এর দশকে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে ব্যাংকগুলো লাভের ধারায় ফিরেছিল। এমনকি ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্তও ব্যাংক খাত সামগ্রিকভাবে লাভে ছিল। ওই সময় ব্যাংকের সম্পদের বিপরীতে আয় ছিল দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং মূলধনের বিপরীতে আয় ছিল ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ।


তবে এরপর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসার পর ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।


খেলাপি ঋণের ভারে আয় কমছে
২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতিও এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়।


এর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বরেও ব্যাংকগুলোর সম্পদের বিপরীতে আয় ছিল ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং মূলধনের বিপরীতে আয় ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত দেড় দশকে ব্যাংকগুলোর আয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২৫ সালের মার্চে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। এ সময় গড় হিসাবে ব্যাংক খাত লোকসানে চলে যায়।


এক বছরে লোকসান বেড়েছে কয়েক গুণ
২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংকগুলোর সম্পদের বিপরীতে গড় লোকসান ছিল দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা সম্পদের বিপরীতে লোকসান হয় ১৮ পয়সা। একই সময়ে মূলধনের বিপরীতে লোকসান দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ।


জুনে সম্পদের বিপরীতে লোকসান আরও বেড়ে দাঁড়ায় দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং মূলধনের বিপরীতে লোকসান হয় ১৬ দশমিক ১১ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে সম্পদের বিপরীতে লোকসান ছিল দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং মূলধনের বিপরীতে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ।


সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ডিসেম্বর মাসে। ওই সময়ে সম্পদের বিপরীতে লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর লোকসান হয়েছে ৪ টাকা ৮১ পয়সা।


মূলধনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ডিসেম্বর শেষে মূলধনের বিপরীতে লোকসান দাঁড়ায় ২৪৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা মূলধনের বিপরীতে লোকসান হয়েছে ২৪৩ টাকা ৯০ পয়সা।


বেসরকারি ব্যাংকেই ক্ষতি বেশি
ব্যাংকভেদে লোকসানের চিত্রেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো।


ওই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সম্পদের বিপরীতে গড় লোকসান ছিল ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর লোকসান ছিল দশমিক ৩২ শতাংশ এবং সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকের ২ দশমিক ৮০ শতাংশ।


তবে বিদেশি ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিল। এ সময়ে তাদের সম্পদের বিপরীতে মুনাফা ছিল ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
মূলধনের বিপরীতেও একই চিত্র দেখা যায়। বেসরকারি ব্যাংকগুলো ১৮৪ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ লোকসান দেয়। সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকের লোকসান ছিল ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। বিপরীতে বিদেশি ব্যাংকগুলো মূলধনের বিপরীতে ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ মুনাফা করেছে।


খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকা
ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর হয়েছে চলতি বছরের মার্চে। এ সময় খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতিও বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।


অর্থাৎ খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চয় বা প্রভিশন ঘাটতিও বাড়ছে। এর ফলে ব্যাংকের মূলধন ক্রমেই ক্ষয় হচ্ছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও চাপে পড়ছে।


পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ
ব্যাংক খাতের এই সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। খেলাপি ঋণ শনাক্তকরণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রভিশন সংরক্ষণ এবং মূলধন শক্তিশালী করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে সময় লাগছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে শুধু নতুন নীতি গ্রহণ করলেই হবে না; অতীতের ঋণ অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বের করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।


ব্যাংকের আয়ের বড় অংশ আসে ঋণের সুদ ও অন্যান্য সম্পদ থেকে। তাই ঋণ আদায় ব্যাহত হয়ে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের আয় কমে যায়। আর আয় কমে গেলে প্রভিশন সংরক্ষণ ও মূলধন ধরে রাখার সক্ষমতাও দুর্বল হয়। এভাবেই দেশের ব্যাংক খাত এখন রেকর্ড লোকসানের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।