একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তাকে ‘ব্যর্থ’ আখ্যা দেওয়া কতটা যৌক্তিক—এই প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক মন্তব্যটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, পাঁচ মাসও পূর্ণ হওয়ার আগে সরকারকে ব্যর্থ বলা ‘ভীষণ রাজনৈতিক ও সামাজিক অসহিষ্ণুতা’। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, টেকসই গণতন্ত্রের জন্য ধৈর্য, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সরকারকে কাজ করার সময় দেওয়া প্রয়োজন।
ফখরুলের এই বক্তব্যকে শুধু সরকারের পক্ষে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখলে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বাদ পড়ে যায়। কারণ একটি সরকারকে মূল্যায়ন করতে যেমন তার ঘোষিত কর্মসূচি, সময়সীমা ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট বিবেচনা করা দরকার, তেমনি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন, বাজারদর, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, প্রশাসনের কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণও বিবেচনায় নিতে হয়।
তবে এখানে প্রথমেই একটি পার্থক্য করা জরুরি—‘সরকার ব্যর্থ’ এবং ‘সরকারের কোনো কাজে ব্যর্থতা আছে’—দুটি এক কথা নয়। একটি সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কোনো মন্ত্রণালয়ের কাজে গাফিলতি থাকলে তার সমালোচনা করা যাবে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা থাকলে প্রশ্ন তোলা যাবে, আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু পুরো সরকারকে ব্যর্থ ঘোষণা করা একটি বড় রাজনৈতিক মূল্যায়ন; তার জন্য আরও বিস্তৃত সময় ও প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে।
ফখরুলের বক্তব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি এখানেই। একটি সরকার মাত্র পাঁচ মাসে দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সংকটের সব সমাধান করে ফেলবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেছেন, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, দেশকে সংকটপূর্ণ অবস্থায় পেয়েছে এবং বিগত ১৫ বছরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং খাতসহ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট কাটাতে সময় প্রয়োজন।
এই যুক্তিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো সুইচ টিপে পরিবর্তন করার বিষয় নয়। একটি সরকারের সিদ্ধান্তের ফল অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান কিংবা আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান হতে সময় লাগে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা থাকলে নতুন সরকারকে প্রথমে পরিস্থিতি বুঝতে, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করতে এবং নীতির ধারাবাহিকতা তৈরি করতে হয়।
কিন্তু এখানেই ফখরুলের বক্তব্যের দ্বিতীয় দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে সময় দেওয়া মানে সরকারকে প্রশ্নহীন ছাড় দেওয়া নয়। গণতন্ত্রে জনগণ সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর প্রশ্ন করবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং প্রতিদিনের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি সিদ্ধান্ত জনগণের পর্যবেক্ষণের অধীন। পাঁচ মাসে সরকারকে ‘ব্যর্থ’ বলা হয়তো তাড়াহুড়ো হতে পারে, কিন্তু পাঁচ মাসে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া বা সতর্ক করা কোনোভাবেই অসহিষ্ণুতা নয়।
বরং একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সমালোচনা সরকারকে আরও ভালো করার অন্যতম মাধ্যম। সরকার যদি শুধু প্রশংসা শুনতে চায়, তাহলে তার সামনে বাস্তব সমস্যাগুলো পৌঁছাবে না। বিরোধী দল, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক—সবাই সরকারের কাজের সমালোচনা করার অধিকার রাখেন।
ফখরুল নিজেই তাঁর বক্তব্যে টেকসই গণতন্ত্রের জন্য ধৈর্য ও পরমতসহিষ্ণুতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কিন্তু পরমতসহিষ্ণুতার অর্থ শুধু সরকারের প্রতি বিরোধীদের ধৈর্য দেখানো নয়; সরকারেরও সমালোচনাকারীদের বক্তব্য সহ্য করার সক্ষমতা থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক সহনশীলতা একমুখী হলে সেটি আর সহনশীলতা থাকে না।
সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের মূল্যায়নে অর্থনীতির প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি আগের বছরের তুলনায় কমে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে এসেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৮ দশমিক ৬ শতাংশের কাছাকাছি নেমেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি চার বছর ধরে ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানগতভাবে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যচাপ এখনো বড় বাস্তবতা।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার বাস্তব চিত্র। একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে টানা ৫৩ মাস মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম ছিল। ফলে সীমিত ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
এই পরিস্থিতিতে একজন নাগরিক যখন বলেন, ‘সরকার ভালো করছে না’, তখন তাঁকে অসহিষ্ণু বলা সহজ; কিন্তু তাঁর ঘরের বাজারের হিসাবটি উপেক্ষা করা কঠিন। চাল, ডাল, তেল, সবজি, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসাভাড়া কিংবা পরিবহন ব্যয়ের চাপ যদি আয় বৃদ্ধির তুলনায় বেশি হয়, তাহলে সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের পরিসংখ্যান নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না।
আবার সরকারের পক্ষেও যুক্তি রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে আমদানি সহজীকরণ, শুল্ক ও করহার যৌক্তিকীকরণ এবং বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার কথা সরকার সংসদে জানিয়েছে। অর্থাৎ বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো—পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটি একমাত্র মূল্যায়নের বিষয় নয়; পদক্ষেপের ফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিই আসল। সরকারের ঘোষণা আর বাজারের বাস্তবতার মধ্যে যদি বড় ব্যবধান থাকে, তাহলে সমালোচনা হবেই।
আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সরকার বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই পরিকল্পনা ইতিবাচক। কিন্তু নাগরিকের কাছে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনার চেয়ে নিরাপত্তার বাস্তব অনুভূতিই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি রাতে নিরাপদে চলাচল করতে না পারেন, ব্যবসায়ী যদি চাঁদাবাজির ভয় পান, নারী যদি গণপরিবহনে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ যদি হামলার শিকার হন, তাহলে সরকারকে প্রশ্ন করা নাগরিকের অধিকার।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর করার নামে যদি আবারও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচার গ্রেপ্তার কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানির সংস্কৃতি ফিরে আসে, সেটিও গ্রহণযোগ্য হবে না। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম শিক্ষা ছিল—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইন ও মানবাধিকারের সীমা অতিক্রম করা যাবে না।
সরকারের আরেকটি বড় পরীক্ষার জায়গা রাষ্ট্র সংস্কার। মির্জা ফখরুল এর আগে বলেছেন, সরকার বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সরকার আরও বলেছে, জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা হবে।
এখানে জনগণের প্রত্যাশা খুব স্পষ্ট—সংস্কার যেন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, পুলিশ সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি—এসব বিষয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন প্রয়োজন।
অন্যদিকে সংস্কারের নামে যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বাদ দেওয়া, প্রতিষ্ঠানকে নতুন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া কিংবা পুরোনো কাঠামোর জায়গায় নতুন দলীয় কাঠামো তৈরি করা হয়, তাহলে সেটিকে সংস্কার বলা যাবে না। সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—তারা নিজেদের জন্য যেমন নিয়ম তৈরি করছে, ভবিষ্যৎ বিরোধীদের জন্যও একই নিয়ম রাখতে পারছে কি না।
ফখরুলের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রাজপথের আন্দোলন নিয়ে তাঁর আপত্তি। তিনি বলেছেন, পাঁচ বছর সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না—এমন বক্তব্য এবং দ্রুত রাজপথে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী।
এই বক্তব্যের একটি যৌক্তিক ভিত্তি আছে। নির্বাচিত সরকারকে প্রতিদিনের রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে অস্থিতিশীল করা হলে রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো সরকারকে কাজ করার ন্যূনতম সময় না দিলে নীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নির্বাচন যদি জনগণের ম্যান্ডেট দেয়, তাহলে সেই ম্যান্ডেটের প্রতি সম্মান দেখানোও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা যাবে না। শান্তিপূর্ণ সভা, সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন, প্রতিবাদ কিংবা নীতির বিরোধিতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক উপাদান। সরকারকে পাঁচ বছর সময় দেওয়া হবে কি না, সেটিও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে। জনগণের অসন্তোষকে শুধু ‘অসহিষ্ণুতা’ বলে বাতিল করে দেওয়া গণতন্ত্রের জন্য ভালো বার্তা নয়।
এখানেই সরকারের সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সম্পর্কের ভারসাম্য প্রয়োজন। সরকারকে যেমন অস্থির করার রাজনীতি পরিহার করা দরকার, তেমনি সরকারেরও বিরোধী মতকে রাষ্ট্রবিরোধী বা ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিহার করতে হবে।
গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ফখরুল নিজ বক্তব্যে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের সংকট, সম্পাদকদের চাকরিচ্যুতি এবং মালিকদের ব্যাংকঋণনির্ভরতার কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা বলেছেন। একই সেমিনারে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেছেন, সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ না করে নির্দিষ্ট নিয়ম চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে এবং একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরির কাজ চলছে।
এখানে সরকারের জন্য একটি বড় সুযোগ রয়েছে। স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে পারলে সরকার তার কাজের ইতিবাচক দিক যেমন প্রচার করতে পারবে, তেমনি ভুল-ত্রুটিও দ্রুত জানতে পারবে। আর সমালোচনামূলক গণমাধ্যমকে শত্রু হিসেবে দেখলে সরকার নিজের চারপাশে একটি কৃত্রিম প্রশংসার দেয়াল তৈরি করবে।
সরকারকে ব্যর্থ বলার প্রবণতা তাই কখনো কখনো রাজনৈতিক অতিরঞ্জন হতে পারে, কিন্তু সেই বক্তব্যের পেছনে জনগণের বাস্তব অসন্তোষ আছে কি না, সেটিও সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে। সমালোচনার ভাষা যদি কঠোর হয়, সরকারকে দেখতে হবে কেন মানুষ এমন ভাষা ব্যবহার করছে। কারণ রাজনৈতিক স্লোগান অনেক সময় বাস্তব জীবনের হতাশার প্রতিধ্বনি।
একইভাবে বিরোধীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সরকার মাত্র পাঁচ মাসে সব সংকটের সমাধান করতে পারেনি—এ কারণে তাকে ব্যর্থ বলা যেমন তাড়াহুড়ো হতে পারে, তেমনি সরকারের প্রতিটি ব্যর্থতা বা ভুলকে ‘সময় লাগবে’ বলে আড়াল করাও দায়িত্বশীল রাজনীতি নয়।
একটি কার্যকর গণতন্ত্রে সরকারের জন্য সময় থাকবে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে জবাবদিহিও থাকবে। বিরোধীদের জন্য আন্দোলনের অধিকার থাকবে, কিন্তু আন্দোলনের নামে সহিংসতা বা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ধ্বংসের সুযোগ থাকবে না। গণমাধ্যম স্বাধীন থাকবে, কিন্তু ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্যের দায়ও থাকবে। নাগরিক সমালোচনা করবেন, সরকার তা শুনবে এবং প্রয়োজন হলে সংশোধন করবে—এই পারস্পরিক সম্পর্কই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
ফখরুলের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তাই হয়তো ‘সরকারকে ব্যর্থ বলবেন না’ নয়; বরং ‘মূল্যায়নে তাড়াহুড়ো করবেন না’। একটি সরকারকে বিচার করতে হলে তার ঘোষিত লক্ষ্য, হাতে থাকা সম্পদ, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট, নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের ফল—সবকিছু একসঙ্গে দেখতে হবে।
পাঁচ মাসে সরকারকে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ ঘোষণা করা যেমন অপরিণত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে, তেমনি পাঁচ মাস হয়েছে বলে সরকারের ভুলের হিসাব না নেওয়াও গণতান্ত্রিক দায়িত্বহীনতা। সময় এবং জবাবদিহি—দুটিই একসঙ্গে চলতে হবে।
সরকারের উচিত সমালোচনাকে ভয় না পাওয়া। বরং সমালোচনাকে তিন ভাগে দেখা যেতে পারে—অমূলক রাজনৈতিক প্রচারণা, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা এবং গঠনমূলক পরামর্শ। প্রথমটি উপেক্ষা করা যায়, দ্বিতীয়টির জবাব তথ্য দিয়ে দিতে হয় এবং তৃতীয়টি গ্রহণ করতে হয়। এভাবেই একটি সরকার নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ পায়।
একইভাবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিরও উচিত সরকারকে অকারণে অস্থিতিশীল না করে বিকল্প নীতি উপস্থাপন করা। শুধু ‘সরকার ব্যর্থ’ বললে জনগণ জানতে চান—তাহলে আপনারা কী করবেন? দ্রব্যমূল্য কীভাবে কমাবেন, কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়াবেন, আইনশৃঙ্খলা কীভাবে উন্নত করবেন, ব্যাংক খাতের সংকট কীভাবে সমাধান করবেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে স্বাধীন করবেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে।
রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন সরকার শুধু বিরোধীদের দোষ দেখে এবং বিরোধীরা শুধু সরকারের ব্যর্থতা দেখে। উভয় পক্ষ যদি রাষ্ট্রের সমস্যাকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অস্তিত্বের সঙ্গে এক করে ফেলে, তাহলে জনগণের প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায়।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই রাজনৈতিক পরিপক্বতাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছে, তা কোনো একটি দলের বিজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
তাই মির্জা ফখরুলের ‘এখনই ব্যর্থ বলা অসহিষ্ণুতা’ মন্তব্যের প্রতিফলন যদি করতে হয়, তাহলে বলা যায়—হ্যাঁ, একটি নতুন সরকারকে মাত্র পাঁচ মাসে চূড়ান্ত ব্যর্থতার সার্টিফিকেট দেওয়া তাড়াহুড়ো হতে পারে। কিন্তু সেই সরকারের কাজের প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার।
সরকারের জন্য সময় প্রয়োজন—কিন্তু সেই সময়ের হিসাবও জনগণ রাখবে। সরকারকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে—কিন্তু কাজের ফলও দেখাতে হবে। সমালোচনা সহ্য করতে হবে—কিন্তু অমূলক অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে কথা বলতে হবে। বিরোধীদের আন্দোলনের অধিকার থাকবে—কিন্তু সহিংসতা নয়। আর জনগণকে শুধু ধৈর্য ধরতে বললে হবে না; তাঁদের আস্থার কারণও তৈরি করতে হবে।
শেষ বিচারে কোনো সরকারকে সফল বা ব্যর্থ ঘোষণা করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিচারক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, জনগণের জীবন। বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে কি না, কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, বিনিয়োগ বাড়ছে কি না, আইনশৃঙ্খলায় স্বস্তি ফিরছে কি না, দুর্নীতি কমছে কি না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ হচ্ছে কি না এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিরাপদ কি না—এসব সূচকেই সরকারের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।
সুতরাং আজকের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—‘সরকার ব্যর্থ কি না?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘সরকার কোন ক্ষেত্রে কতটা এগিয়েছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং কত সময়ের মধ্যে কী ফল দিতে পারবে?’ এই প্রশ্নই বেশি গণতান্ত্রিক, বেশি দায়িত্বশীল এবং জনগণের জন্য বেশি কার্যকর।
একটি সরকারকে সময় দেওয়া যেমন গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা, তেমনি সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়াও গণতন্ত্রেরই দাবি। এই দুইয়ের ভারসাম্য নষ্ট হলেই অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়। আর সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই মির্জা ফখরুল যে পরমতসহিষ্ণুতার কথা বলেছেন, তা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য না হয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বাস্তব চর্চায় পরিণত হতে পারে।
লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা, ঢাকা, বাংলাদেশ।