গণমাধ্যমকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোয় আনার দাবি নতুন নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দাবির অর্থ ও প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের প্রয়োজন যেমন স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও পেশাদার সাংবাদিকতা, তেমনি প্রয়োজন মিথ্যা তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার, ঘৃণাবাচক বক্তব্য, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন এবং পেশাগত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে গণমাধ্যম হয় নিয়ন্ত্রণের শিকার হবে, নয়তো দায়িত্বহীনতার সুযোগ তৈরি হবে।
সুতরাং ‘গণমাধ্যমকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোয় আনা’ কথাটিকে প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার। এর অর্থ কোনো সরকারের পছন্দ অনুযায়ী সংবাদ প্রকাশের সীমা নির্ধারণ করা নয়। এর অর্থ হওয়া উচিত—গণমাধ্যম পরিচালনা, সাংবাদিকতার পেশাগত মান, মালিকানা, বিজ্ঞাপন, সাংবাদিকের অধিকার, পাঠকের অভিযোগ, তথ্য যাচাই, ভুল সংবাদ সংশোধন এবং সাংবাদিকের নিরাপত্তার জন্য একটি স্বচ্ছ ও স্বাধীন কাঠামো তৈরি করা।
বাংলাদেশে এই আলোচনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় চাপের পাশাপাশি মালিকানা ও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নও দীর্ঘদিনের। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের মূল্যায়নে, দেশের বড় অনেক বেসরকারি গণমাধ্যম কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন এবং মালিকদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় সম্পাদকীয় স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে আগের সরকারের সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির অভিযোগও ছিল।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে সাংবাদিক যা খুশি তাই প্রকাশ করবেন, এমন নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব অবিচ্ছেদ্য। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো তথ্য সংগ্রহ করা, যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, তথ্য ও মতামতের পার্থক্য বজায় রাখা এবং ভুল হলে তা দ্রুত সংশোধন করা। সংবাদে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য, গুজব কিংবা কাউকে অন্যায়ভাবে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করার অধিকার কোনো স্বাধীনতার অংশ হতে পারে না।
কিন্তু সেই দায়িত্ব নিশ্চিত করার পদ্ধতিও হতে হবে গণতান্ত্রিক। সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা রাজনৈতিক দলের কার্যালয় যদি ঠিক করে দেয় কোন সংবাদ সত্য, কোন সংবাদ মিথ্যা এবং কোন সাংবাদিক পেশাদার—তাহলে সেটি স্বাধীন গণমাধ্যমের কাঠামো নয়; সেটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। তাই গণমাধ্যমের জবাবদিহির জন্য যে প্রতিষ্ঠানই তৈরি করা হোক, তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
বর্তমান সরকার প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেছেন, প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা, সাংবাদিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা এবং মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও অনৈতিক সংবাদ প্রকাশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার বলছে, তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতে committed।
প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য যদি সত্যিই সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন হয়, তাহলে তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে। কিন্তু ‘সাংবাদিক নিবন্ধন’ শব্দটি বিশেষভাবে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। সাংবাদিক কে—এটি নির্ধারণের ক্ষমতা যদি কোনো সরকারি দপ্তরের হাতে থাকে এবং নিবন্ধন না থাকলে কেউ সাংবাদিকতা করতে না পারেন, তাহলে তা সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতার ওপর অপ্রত্যাশিত বাধা তৈরি করতে পারে।
বরং সাংবাদিক নিবন্ধনের প্রয়োজন হলে তার ভিত্তি হওয়া উচিত পেশাগত পরিচয় ও স্বচ্ছ তথ্য, সরকারের অনুমোদন নয়। একজন সাংবাদিক কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হতে পারেন, ফ্রিল্যান্সার হতে পারেন, স্থানীয় সংবাদকর্মী হতে পারেন কিংবা অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। এই বৈচিত্র্যকে একটি সরকারি তালিকার মধ্যে বন্দী করার চেষ্টা করলে বাস্তব সাংবাদিকতার সঙ্গে আইনি কাঠামোর সংঘাত তৈরি হতে পারে।
একইভাবে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ সমস্যা বাস্তব হলেও এর সমাধান হতে হবে সতর্কতার সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, প্রতারণা কিংবা ভয়ভীতি দেখানো অবশ্যই অপরাধ এবং এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু কোনো সাংবাদিকের সংবাদ সরকারের পছন্দ হয়নি বলেই তাঁকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। অপরাধের বিচার এবং সাংবাদিকতার বৈধতা—এই দুটি বিষয়কে আলাদা রাখতে হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। সরকার মে মাসে জানিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে একটি কার্যকর ও স্বাধীন মিডিয়া কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং কমিশনের নামে গণমাধ্যমের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
এই প্রতিশ্রুতিই বাস্তব পরীক্ষার জায়গা। মিডিয়া কমিশন যদি সত্যিই স্বাধীন হয়, তাহলে তার সদস্য নির্বাচন কীভাবে হবে, অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী হবে, সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থা থাকবে কি না এবং রাজনৈতিক চাপ থেকে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—এসব বিষয় আইনে স্পষ্ট করতে হবে।
কারণ একটি স্বাধীন কমিশন তৈরি করলেই সেটি স্বাধীন হয়ে যায় না। কমিশনের নিয়োগব্যবস্থা যদি সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, বাজেট যদি সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকর স্বাধীন আপিলব্যবস্থা না থাকে, তাহলে নামের আগে ‘স্বাধীন’ শব্দটি বসালেও প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন থাকবে না।
এখানে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। সাংবাদিকদের সংগঠন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অধিকার সংস্থাগুলো আগের সরকারের সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, আটক ও আইন ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে। আরএসএফ ২০২৬ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আগের সরকারের আমলে করা কিছু মামলা প্রত্যাহার, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সাংবাদিক সুরক্ষায় পৃথক আইন করার সুপারিশ করেছে।
সিপিজেও বর্তমান সরকারের কাছে সতর্ক করেছে যে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নতুন কোনো কাঠামো যেন আগের দমনমূলক ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি না ঘটায়। সংগঠনটি বিদ্যমান খসড়া জাতীয় মিডিয়া কমিশন ও সম্প্রচার কমিশনসংক্রান্ত বিধান পুনর্বিবেচনা করে মিডিয়া সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
এই সতর্কতাকে শুধু বিদেশি সংগঠনের বক্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যেরও সূচক। একটি সরকার নিজের সমালোচনা সহ্য করতে পারছে কি না, দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিক নিরাপদ থাকছেন কি না, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব কি না এবং বিরোধী মতের সংবাদ প্রকাশের সুযোগ আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়।
তবে গণমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনও অস্বীকার করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এখন সংবাদ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত কনটেন্ট নির্মাতার মধ্যে সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট। একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই তথ্য যাচাই, উৎস যাচাই এবং সংশোধনের সংস্কৃতি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদেরও দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে শক্তিশালী সম্পাদকীয় নীতিমালা, ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থা, স্বার্থের সংঘাত প্রকাশের নিয়ম, ভুল সংবাদ সংশোধনের নীতি এবং পাঠক বা দর্শকের অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকা উচিত। সাংবাদিকতার মান উন্নত করার জন্য সরকারের লাইসেন্সের চেয়ে এই আত্মনিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো সংবাদমাধ্যম যদি এক বা দুইজন ব্যবসায়ীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মালিকানা স্বচ্ছতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রকাশ এবং সংবাদ ও বিজ্ঞাপনের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন প্রতিষ্ঠা করা তাই জরুরি।
সরকারি বিজ্ঞাপনও যেন সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র না হয়। একটি সংবাদমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করল বলে তার বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাবে—এমন পরিবেশ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ক্ষতিকর। আবার সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রতি বিশেষ আনুগত্য দেখাবে—এটিও সমানভাবে অনৈতিক।
গণমাধ্যমের কাঠামো নিয়ে আলোচনায় সাংবাদিকের শ্রম অধিকারও প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়। একজন সাংবাদিক যদি বেতন না পান, চাকরির নিশ্চয়তা না থাকে, মাঠে কাজ করতে গিয়ে নিরাপত্তা না পান কিংবা সংবাদ প্রকাশের কারণে মালিকপক্ষের চাপের মুখে পড়েন, তাহলে কেবল প্রেস কাউন্সিল শক্তিশালী করে পেশাদার সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি তাঁদের জবাবদিহিও থাকতে হবে। সাংবাদিকের পরিচয় তাঁকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ঘুষ কিংবা ইচ্ছাকৃত অপরাধ করলে সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে থাকার সুযোগ থাকা উচিত নয়। কিন্তু কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তাঁর সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্য অধিকার। ২০২৬ সালে তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের মাধ্যমে তথ্যের সংজ্ঞা সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রবাহ ও জবাবদিহি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ধরনের সংস্কার গণমাধ্যমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাংবাদিকতা কার্যকর করতে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যের প্রবেশাধিকার অপরিহার্য।
অর্থাৎ গণমাধ্যমের সংস্কার শুধু সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; এটি সরকারের তথ্যপ্রকাশের সংস্কারের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। সাংবাদিক যদি সরকারি নথি, পরিসংখ্যান, প্রকল্পের ব্যয়, সিদ্ধান্তের ভিত্তি কিংবা প্রশাসনিক তথ্য সহজে না পান, তাহলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্বল হবে। তথ্যের দরজা বন্ধ রেখে সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান তাই এক ধরনের অসম প্রত্যাশা।
গণমাধ্যমের ওপর নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো প্রয়োজন, কিন্তু সেই কাঠামোর প্রথম নীতি হওয়া উচিত—রাষ্ট্র সংবাদ নিয়ন্ত্রণ করবে না; রাষ্ট্র সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা করবে। দ্বিতীয় নীতি হওয়া উচিত—স্বাধীনতার নামে অনিয়মও প্রশ্রয় পাবে না। তৃতীয় নীতি—জবাবদিহির প্রতিষ্ঠান সরকার থেকে স্বাধীন থাকবে। চতুর্থ নীতি—সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার হবে নিরপেক্ষ ও আইনি প্রক্রিয়ায়। পঞ্চম নীতি—জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এই কাঠামোর সবচেয়ে ভালো মডেল হতে পারে ‘রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ’ নয়, বরং ‘স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ও পেশাগত আত্মনিয়ন্ত্রণের সমন্বয়’। প্রেস কাউন্সিল, মিডিয়া কমিশন, সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান, ফ্যাক্ট-চেকিং সংগঠন এবং আদালত—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আলাদা হতে হবে। কেউ যেন একই সঙ্গে অভিযোগকারী, তদন্তকারী এবং বিচারক হয়ে না যায়।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের আলোচনায় গণমাধ্যমের প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে সমাজে নাগরিকেরা সরকারের সমালোচনা করতে পারেন না, সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারে না। আবার যে সমাজে সংবাদ যাচাই ছাড়াই যেকোনো অভিযোগ প্রচার করা যায়, সেখানেও গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
আমার দৃষ্টিতে গণমাধ্যমকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোয় আনার সঠিক অর্থ হলো—‘স্বাধীনতার জন্য নিয়ম, নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়ম নয়’। নিয়ম থাকবে সাংবাদিকতার পেশাগত মান রক্ষায়, কিন্তু সংবাদ কী হবে তা নির্ধারণে নয়। আইন থাকবে সাংবাদিকের অপরাধের বিচার করতে, কিন্তু সংবাদ প্রকাশের আগে অনুমতি নিতে বাধ্য করতে নয়। কমিশন থাকবে অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে, কিন্তু সরকারের সমালোচনা বন্ধ করতে নয়।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো এমন একটি মিডিয়া কাঠামো তৈরি করা, যা বর্তমান সরকারের জন্য নয়—আগামী সব সরকারের জন্য প্রযোজ্য হবে। আজ যে ক্ষমতা দিয়ে একটি সরকার নিজের সমালোচনাকারী সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই ক্ষমতাই আগামীকাল অন্য কোনো সরকার আরও কঠোরভাবে ব্যবহার করতে পারে। তাই আইন এমন হতে হবে, যার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে নাগরিক, কোনো সরকার নয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা মানে সাংবাদিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়। বরং নাগরিকের জানার অধিকার রক্ষা করা। একজন সাংবাদিক দুর্নীতির খবর প্রকাশ করলে সেই খবরের পাঠকই উপকৃত হন। কোনো হাসপাতালে অনিয়ম প্রকাশিত হলে রোগী উপকৃত হন। কোনো সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি প্রকাশিত হলে করদাতা উপকৃত হন। কোনো অন্যায়ের শিকার মানুষের কথা সংবাদে উঠে এলে ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা বাড়ে।
তাই গণমাধ্যমকে দুর্বল করে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না। বরং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও পেশাদার গণমাধ্যম রাষ্ট্রের ভুল ধরিয়ে দেয়, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রকাশ করে এবং জনগণ ও সরকারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি গণমাধ্যমব্যবস্থা যেখানে সাংবাদিক স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করবেন, সম্পাদক স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, মালিকানা স্বচ্ছ থাকবে, ভুল সংবাদ সংশোধন হবে, অপরাধের বিচার হবে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক সরকার সংবাদ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পাবে না। গণমাধ্যমের শৃঙ্খলা চাই—অবশ্যই; পেশাদারিত্ব চাই—অবশ্যই; জবাবদিহি চাই—অবশ্যই। কিন্তু এসবের কোনোটি যেন স্বাধীনতার বিকল্প না হয়।
কারণ গণমাধ্যমকে নিয়মের মধ্যে আনার সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে আইনের সুরক্ষার মধ্যে আনা। নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি করা সহজ; স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহির ভারসাম্য তৈরি করাই আসল রাষ্ট্রীয় দক্ষতার পরীক্ষা। বাংলাদেশ যদি সেই পরীক্ষায় সফল হতে পারে, তাহলে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রকাশ করবে না—গণতন্ত্রকেও প্রতিদিন পাহারা দেবে।
লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা, ঢাকা, বাংলাদেশ।