বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের চরিত্র, ক্ষমতার ব্যবহার এবং নাগরিকের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রশ্নের বিস্ফোরণ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তার পেছনে ছিল বৈষম্য, রাজনৈতিক দমন, জবাবদিহির ঘাটতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাহীনতার বিস্তৃত অভিজ্ঞতা। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই আন্দোলন দমনের সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।
সেই অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—যে পরিবর্তনের জন্য মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেই পরিবর্তন রাষ্ট্রের কাঠামোতে কতটা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? একটি সরকার পরিবর্তনই যদি জুলাইয়ের চূড়ান্ত অর্জন হয়, তাহলে আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে। কারণ মানুষের ক্ষোভ কেবল একটি ব্যক্তিকে বা একটি দলকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য ছিল না; এর গভীরে ছিল এমন একটি রাষ্ট্রের প্রত্যাশা, যেখানে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা দল আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে শুরু থেকেই তিনটি বড় দায়িত্ব নির্ধারিত হয়েছিল—জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই তিন দায়িত্বের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন।
এই তিনটির মধ্যে বিচার ও সংস্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বৈধতার প্রধান ভিত্তি হলেও নির্বাচন নিজে গণতন্ত্রের পূর্ণ নিশ্চয়তা নয়। যদি নির্বাচনের পর আবারও প্রশাসন দলীয়করণ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরোধী মত দমন কিংবা বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পুরোনো সংস্কৃতিতে ফিরে যায়, তাহলে জুলাইয়ের ত্যাগের অর্থই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
জুলাই জাতীয় সনদ এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা থেকে এই সনদের জন্ম। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এর সাংবিধানিক সংস্কারসংক্রান্ত বাস্তবায়ন আদেশও জারি করা হয়। সেখানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মতো একাধিক প্রস্তাব রাখা হয়েছিল।
কিন্তু এখানেই সরকারের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা—জুলাই জাতীয় সনদকে কি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দলিল হিসেবে রাখা হবে, নাকি বাস্তবে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো বদলানো হবে?
সর্বশেষ বক্তব্যগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। ২০ জুলাই স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করবে এবং বিএনপির ৩১ দফার সংস্কার কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হবে।
আইনমন্ত্রীও এর আগে বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি বিধান সংবিধান ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকার সনদ বাস্তবায়ন করবে, তবে সংবিধানকে উপেক্ষা করে নয়।
এই অবস্থান সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানেই প্রশ্ন উঠতে পারে—সংবিধানকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি সংস্কারের মূল আকাঙ্ক্ষাই ধীর হয়ে যায়, তাহলে কী হবে? আবার রাজনৈতিক সমঝোতার নামে যদি সংবিধানের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটিও ভবিষ্যতে নতুন সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারে। তাই সরকারের কাজ হবে এই দুই প্রান্তের মধ্যে একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি করা।
জুলাইয়ের চেতনা প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত হতে পারে বিচার। যারা আন্দোলনকারীদের ওপর বেআইনি প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ, হত্যা, নির্যাতন বা অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের বিচার হতে হবে। কিন্তু সেই বিচার হতে হবে প্রমাণনির্ভর, স্বচ্ছ এবং ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত। বিচার যদি প্রতিশোধে পরিণত হয়, তাহলে জুলাইয়ের ন্যায়বিচারের দাবি দুর্বল হয়ে পড়বে।
একইভাবে, কোনো রাজনৈতিক দলের অপরাধের দায় পুরো দলের প্রতিটি সদস্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়বিচার হতে পারে না। ব্যক্তির অপরাধের বিচার ব্যক্তির বিরুদ্ধে হতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তেরও অবশ্যই আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে। কারণ জুলাইয়ের অন্যতম শিক্ষা ছিল—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যখন আইন ও ন্যায়ের সীমা অতিক্রম করে, তখন নাগরিকের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়।
সম্প্রতি শেখ হাসিনা দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার সেই অনুষ্ঠানের তীব্র সমালোচনা করেছে। একই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়াও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও আইনের একই মানদণ্ড বজায় রাখা। জুলাইয়ের চেতনা যদি সত্যিই ‘আইনের শাসন’ হয়, তাহলে সেই আইন সরকারপন্থী, বিরোধীপন্থী কিংবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমানভাবে কার্যকর হতে হবে।
জুলাইয়ের আরেকটি বড় দাবি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা। নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম—এসব প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক আনুগত্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্র সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
একটি সরকার পরিবর্তন করে আরেকটি দলকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নয়। বরং নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, তদন্ত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করাই হবে প্রকৃত সংস্কার।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও জুলাইয়ের চেতনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আন্দোলনের সময় তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, ইন্টারনেট বন্ধ, সংবাদ প্রচারে বাধা এবং সাংবাদিকদের ওপর চাপের অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন সংবাদমাধ্যমকে নিজের প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত করতে না পারে, আবার মিথ্যা তথ্য ও উসকানির নামেও যেন স্বাধীন সাংবাদিকতা দমন করা না হয়—এই ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।
জুলাইয়ের চেতনা মানে ভিন্নমতকে সহ্য করার সংস্কৃতিও। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারকে সমর্থন করা যেমন নাগরিকের অধিকার, তেমনি সরকারের সমালোচনা করাও নাগরিকের অধিকার। বিরোধী দলকে শত্রু এবং সমালোচককে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি ফিরে আসে, তাহলে ক্ষমতার হাতবদল হলেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে না।
অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারও এ আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য যদি কমানো না যায়, তাহলে রাজনৈতিক সংস্কারের সুফল মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হবে না। জুলাইয়ের তরুণ প্রজন্ম এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল, যেখানে যোগ্যতার মূল্য থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না।
বিশেষ করে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। যে প্রজন্ম রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল, তাদের যদি আবার বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে জুলাইয়ের প্রত্যাশা দ্রুত হতাশায় পরিণত হতে পারে।
নারী, শিশু, সংখ্যালঘু, শ্রমিক, কৃষক, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারও জুলাইয়ের রাষ্ট্রচিন্তার অংশ হওয়া উচিত। গণঅভ্যুত্থানের চেতনা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের অধিকার কতটা নিরাপদ—সেটিই একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—জুলাইয়ের ইতিহাসকে দলীয় প্রচারণায় পরিণত না করা। যে আন্দোলনে নানা শ্রেণি-পেশা ও রাজনৈতিক মতের মানুষ অংশ নিয়েছিল, সেটিকে যদি কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীর একক অর্জন হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়, তাহলে ইতিহাসের বহুমাত্রিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রয়োজন, কিন্তু স্মৃতি সংরক্ষণ মানে শুধু স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর বা দিবস পালন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি আন্দোলনের দলিল, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, নিহত ও আহতদের তথ্য এবং রাষ্ট্রীয় নথিও সংরক্ষণ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, জুলাইকে ইতিহাসের একটি অধ্যায় বানিয়ে ফেলা যাবে না; জুলাইয়ের মূল্যবোধকে রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন পদ্ধতিতে পরিণত করতে হবে।
সরকারের সামনে এখন তাই জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেয়ে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বড় দায়িত্ব। কারণ জনপ্রিয় সরকারও একদিন ক্ষমতা হারাবে। কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে। আজকের সরকার যদি এমন নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা কাঠামো তৈরি করতে পারে, যা ভবিষ্যৎ কোনো সরকার সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, তবেই জুলাইয়ের প্রকৃত উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। সরকার একা জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। বিরোধী দলকে সংসদীয় জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, সরকারকে বিরোধী মতের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং নাগরিক সমাজকে দলীয় বিভাজনের বাইরে থেকে সংস্কারের ওপর নজর রাখতে হবে।
জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা হবে—‘আমরাই জুলাইয়ের একমাত্র মালিক’ এই দাবি। জুলাই কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের জনগণের একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতা থেকে যে শিক্ষা নেওয়া দরকার, তা হলো—ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বিপজ্জনক, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ বিপজ্জনক এবং জবাবদিহিহীন ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়ায়।
আজকের সরকার যদি এই শিক্ষাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে জুলাই একটি সফল রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সফল রাষ্ট্র সংস্কারের সূচনাও হয়ে উঠবে। আর যদি শুধু ক্ষমতার কাঠামো বদলায়, কিন্তু প্রশাসন, বিচার, নির্বাচন, পুলিশ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুরোনো সমস্যাগুলো একই থাকে, তাহলে ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—জুলাইয়ে এত মানুষ কেন রাস্তায় নেমেছিল?
আমার দৃষ্টিতে জুলাইয়ের চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত পাঁচটি বিষয়ে—ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, অবাধ রাজনৈতিক পরিবেশ এবং নাগরিকের মর্যাদা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সুযোগের সমতা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ। কারণ জনগণ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফল দেখতে চায়।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই—রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের নয়; রাষ্ট্র জনগণের। সরকার আসে এবং যায়, রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় ওঠে ও নামে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
তাই জুলাইয়ের চেতনা প্রতিষ্ঠার প্রকৃত অর্থ হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো সরকার নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাববে না, কোনো নাগরিক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অধিকার হারাবে না, কোনো প্রতিষ্ঠান দলীয় নির্দেশে নত হবে না এবং কোনো তরুণকে নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য জীবন দিতে হবে না।
জুলাইকে স্মরণ করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হবে জুলাইয়ের মূল্যবোধকে রাষ্ট্রের নিয়মে পরিণত করা। স্মৃতিতে জুলাই থাকবে, ইতিহাসে জুলাই থাকবে—কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তে যদি ন্যায়, জবাবদিহি, স্বাধীনতা ও মানুষের মর্যাদা প্রতিফলিত হয়, তবেই বলা যাবে—জুলাইয়ের চেতনা সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
লেখক: নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা, ঢাকা, বাংলাদেশ।