বিশ্ব

মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় প্রবাসীদের বাড়ছে অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় প্রবাসীদের বাড়ছে অনিশ্চয়তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রভাবে ওই অঞ্চলে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, যাতায়াত ও আয়-রোজগার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির ওপর সংঘাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আকাশপথে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়া, কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হলে প্রবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের ওপর এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতিতে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের বিস্তৃতি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে কর্মরত। এসব দেশ সরাসরি সংঘাতের পক্ষ না হলেও আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বিমান চলাচল, বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মস্থলে যাতায়াত ও দেশে আসা-যাওয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সংঘাতের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ ও বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্নের ঘটনা সামনে আসে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, আকাশপথ ও বিমান চলাচল বন্ধ বা সীমিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যগামী বাংলাদেশি কর্মীদের একটি অংশ আটকা পড়েছিলেন। সরকার সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আটকে পড়া নাগরিক ও কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল।

ইরানে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সংঘাতের সময় তেহরানে বাংলাদেশি দূতাবাস, কূটনীতিক ও কর্মীদের নিরাপত্তা এবং ইরানে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিল সরকার। পরবর্তী সময়ে তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস সংঘাত পরিস্থিতির মধ্যে ১৪ বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও করে। তাদের মধ্যে শিশু, নারী, নাবিক এবং চিকিৎসার জন্য ইরানে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব শুধু নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। কর্মসংস্থান কমে গেলে প্রবাসী শ্রমিকদের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নতুন করে বিদেশযাত্রার প্রবাহ কমে যাওয়ার এবং কাজ ও মজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অভিবাসন ব্যাহত হলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীদের আরেকটি বড় ঝুঁকি হতে পারে কর্মস্থল ও আবাসস্থলের নিরাপত্তা। সামরিক হামলা বা পাল্টা হামলার বিস্তৃতি ঘটলে শ্রমিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য ও যোগাযোগ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। সংঘাতের পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের বেতন আটকে যাওয়া, কর্মস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়া বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে চুক্তিগত জটিলতার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকারবিষয়ক পর্যবেক্ষণেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে তা শুধু প্রবাসীদের জীবন ও কর্মসংস্থানেই নয়, তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবার এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও শ্রমকল্যাণ উইংয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজন হলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি থাকা জরুরি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সংঘাতের সময় বাংলাদেশি শ্রমিকদের সহায়তার জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছিল এবং বিদেশস্থ শ্রমকল্যাণ উইংগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা রেখেছিল।

একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি গুজব বা যাচাইহীন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং নিজ নিজ দেশের সরকারি নিরাপত্তা নির্দেশনা ও বাংলাদেশি দূতাবাসের পরামর্শ অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি কী দিকে যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ অভিবাসন পরিস্থিতির পরবর্তী চিত্র।