বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, এস আলমসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়ার পর ব্যাংকটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, শাখা পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার সরাসরি দুদকে অভিযোগ দেওয়ার নিয়ম নেই। এ কারণে বিভাগীয় তদন্তের স্বার্থে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, এস আলমসহ ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে ব্যাংকের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগটি গ্রহণের পর ব্যাংকের অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, কোনো শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তা সরাসরি দুদকের কাছে প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে অভিযোগ দেওয়ার আগে ব্যাংকের নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর ইয়াসিন আলীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তদন্ত নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থেই তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তবে কোনো কর্মকর্তা সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করলেই অভিযোগটি সত্য বা মিথ্যা—কোনোটিই ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে অভিযোগ করার কারণে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপও অভিযোগের বিষয়বস্তুর সত্যতা নির্ধারণ করে না। অভিযোগে উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, ব্যাংকের অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া এবং কথিত আত্মসাতের প্রকৃতি—এসব বিষয় স্বাধীন অনুসন্ধান ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি নিয়ে এর আগেও বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মুরাদ এন্টারপ্রাইজের নামে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ১ হাজার ৯২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এস আলমের ছেলে আহসানুল আলমসহ ৫৮ জনের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে। মামলায় ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, পরিচালক ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়।
ওই মামলার এজাহার অনুযায়ী, মুরাদ এন্টারপ্রাইজের নামে প্রথমে ৮৯০ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা করা হয়। দুদকের অভিযোগ ছিল, জাল কাগজপত্র ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন এবং পরস্পর যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগও বিচারিকভাবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা ইয়াসিন আলীর বিরুদ্ধে নেওয়া সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এখন বিভাগীয় তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তদন্তে তিনি ব্যাংকের প্রচলিত বিধি লঙ্ঘন করে অভিযোগ দিয়েছেন কি না, অভিযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে কি না এবং অভিযোগের পেছনে প্রাসঙ্গিক নথি বা তথ্য রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হতে পারে।
অন্যদিকে দুদকে দেওয়া অভিযোগের বিষয়বস্তু আলাদাভাবে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা আইনগত ও সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নথি, হিসাব বিবরণী, ঋণ অনুমোদনের কাগজপত্র, অর্থ স্থানান্তরের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ঘটনাটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রশ্নও সামনে এনেছে। বিভাগীয় তদন্ত ও দুদকের অনুসন্ধান—দুটি প্রক্রিয়াই স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হলে অভিযোগের প্রকৃত সত্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।