বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছিল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনার জন্য ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও মাহবুব মোর্শেদের বক্তব্য নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী, কমিটির সভাপতি করা হয় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে। সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিবকে। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা এবং গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। অভিযোগগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান শেষে ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।
মাহবুব মোর্শেদ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই বছরের জন্য বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাসস কার্যালয়ে কর্মীদের একাংশের বিক্ষোভের পর তিনি কার্যালয় ছাড়েন। পরবর্তী সময়ে ১৫ মার্চ তিনি এমডি ও প্রধান সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে বাসসের কাজে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পরবর্তী সময়ে দুদকের অনুসন্ধানের সূত্রে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদক থাকার সময় মাহবুব মোর্শেদের নিজের মালিকানাধীন একটি টয়োটা এলিয়ন গাড়ি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাসসের কাছে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নথি অনুযায়ী, জ্বালানি, চালক ও অন্যান্য ব্যয়সহ গাড়িটির মাসিক ভাড়া ছিল দেড় লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এ বাবদ মোট তিন লাখ টাকা পরিশোধের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
দুদক ২৫ জুন ২০২৬ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির’ অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে মাহবুব মোর্শেদকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তলব করে। তাঁকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের অনুলিপিসহ দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়। তবে দুদকের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের পূর্ণ বিবরণ তখন প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও কমিটির সুপারিশ বা প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে কমিটি অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত বা সুপারিশ করেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় পরবর্তী দুদক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদ সংস্থা হিসেবে বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সম্পদ ব্যবহার, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগ ও চুক্তিসংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সুশাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করাও আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির অংশ।
বর্তমানে মাহবুব মোর্শেদ বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদক পদে নেই। তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক তদন্ত এবং দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া গেলে অভিযোগের দায় থেকেও তাঁকে অব্যাহতি দিতে হবে।
বাসসের মতো রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি শুধু একজন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার সঙ্গেও যুক্ত। তাই তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট নথি যথাসম্ভব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র এবং দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হবে।