জাতীয়

ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৬ কর্মকর্তাকে দুদকের তলব

ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৬ কর্মকর্তাকে দুদকের তলব

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা

ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ বিতরণ ও আর্থিক অনিয়ম-সংক্রান্ত অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ব্যাংকটির ১৬ কর্মকর্তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার খবর ১৩ আগস্ট আলোচনায় এসেছে। অনুসন্ধানে ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং আর্থিক লেনদেনে কোনো বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

ন্যাশনাল ব্যাংক বেসরকারি খাতের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক হলেও এর বিরুদ্ধে ওঠা বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের জবাবদিহি ও আর্থিক সুশাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ কারণে বিষয়টি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়মের তালিকার বাইরে হলেও জাতীয় পর্যায়ের আর্থিক দুর্নীতি-অনিয়মের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ব্যাংকটির ঋণসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে এর আগেও দুদক মামলা করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় ব্যাংকের পরিচালক এবং ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়।

দুদকের ওই মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের নীতিমালা ও ঋণের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৬০০ কোটি টাকার ফান্ডেড এবং ৭৫০ কোটি টাকার নন-ফান্ডেড—মোট ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলাটি করা হয়। তবে মামলায় উল্লিখিত অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।

ন্যাশনাল ব্যাংককে ঘিরে ঋণ ব্যবস্থাপনার অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়েও অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এক পর্যায়ে ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং পরে দুর্বল ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সমন্বয়ক নিয়োগের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।

বর্তমান অনুসন্ধানে ১৬ কর্মকর্তার ভূমিকা কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে, কোন কোন ঋণ বা আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না—এসব তথ্য অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা সমীচীন নয়। জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আসা বা দুদকের তলব পাওয়া কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন অর্থও বহন করে না।

ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই, জামানত মূল্যায়ন, ঋণের উদ্দেশ্য নির্ধারণ, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সীমা এবং ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার হয়েছে কি না—এসব বিষয় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো চাপ, প্রভাব বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে বিধি লঙ্ঘন করেছিলেন কি না, সেটিও তদন্তে যাচাইয়ের বিষয় হতে পারে।

দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়মের অভিযোগের প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমানতকারীদের স্বার্থ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ন্যাশনাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধান নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিকভাবে সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ।

দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। আবার পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া গেলে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের দায়ী করার সুযোগ নেই। তাই ১৬ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি আপাতত অনুসন্ধান পর্যায়ের পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। তদন্তের নথি, ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া এবং অর্থের গতিপথ যাচাইয়ের পরই অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।