নিজস্ব প্রতিবেদক:
নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো ২ হাজার ৪২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। আহত অন্তত ১০১ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
দুর্যোগকবলিত এলাকায় তল্লাশি, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে ১৫ হাজার ২২৪ জন নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
বিভিন্ন জেলায় বাড়ছে প্রাণহানি
এর আগে শনিবার সকাল পর্যন্ত ৬১৬টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছিল পুলিশ। এর মধ্যে চিতওয়ানে সর্বাধিক ২৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া পূর্ব নওয়ালপরাসিতে ১৫৮টি, গোর্খায় ৪৮টি, পশ্চিম নওয়ালপরাসিতে ৪৭টি, ধাদিংয়ে ৪৫টি, নুয়াকোটে ৪১টি, তানাহুনে ৩১টি এবং রসুয়ায় ১৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে হালনাগাদ জাতীয় হিসাব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬ জনে পৌঁছায়। এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় এবং দুর্গম কয়েকটি এলাকায় উদ্ধারকারী দল পুরোপুরি পৌঁছাতে না পারায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাহাড়ি ঢলে তছনছ জনপদ
গত বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা দেখা দেয়।
পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীতীরবর্তী বিভিন্ন জনপদে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু, বাড়িঘর এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
পরে বন্যার প্রবল স্রোত ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়লে দুর্যোগের ব্যাপ্তি আরও বাড়ে। স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যায়। মূল দুর্গত এলাকা থেকে ভেসে যাওয়া মরদেহ ভাটির বিভিন্ন জেলায় পৌঁছানোর খবরও পাওয়া গেছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, চলছে উদ্ধার তৎপরতা
বন্যা ও ভূমিধসের কারণে কয়েকটি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দুর্গম অঞ্চলগুলোতে পৌঁছে নিখোঁজদের সন্ধান এবং আটকে পড়াদের উদ্ধারে পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দারা যৌথভাবে কাজ করছেন।
একই সঙ্গে ভূমিধসে বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়ক পরিষ্কার এবং বন্যার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। দ্রুত সড়ক যোগাযোগ চালু করে দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াও এখন কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বিশেষায়িত ক্ষেত্রে বিদেশি সহায়তা
দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষায়িত ও কারিগরি কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।
তিনি বলেছেন, সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিদেশি উদ্ধারকারী দলের প্রয়োজন নেই। তবে টানেলে আটকে পড়াদের উদ্ধার, ধ্বংস হওয়া সেতুর কারণে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, মরদেহ শনাক্তকরণ, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময় মরদেহ সংরক্ষণের মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে নেপালের বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন।
ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ নেপালকে উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।
দুর্গত এলাকায় দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য নেপাল তার দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীনের কাছে বেইলি সেতুর সহায়তা চেয়েছে। ভয়াবহ বন্যায় দেশটির প্রায় দুই ডজন সেতু ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এখনো কয়েক হাজার হওয়ায় নেপালের এই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।