জাতীয়

ইবনে সিনায় শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

ইবনে সিনায় শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

যন্ত্রপাতি কেনাকাটা, ভুয়া বিল-ভাউচার ও উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে প্রশ্ন; অভিযোগের কেন্দ্রে ডা. তাহের

জি এম রফিক, বিশেষ অনুসন্ধান:

রাজধানীর অন্যতম বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা হাসপাতালের বিভিন্ন কেনাকাটা, উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক ব্যয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া বিল-ভাউচার, অতিমূল্যায়িত যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং অস্তিত্বহীন বা সন্দেহজনক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে গত দুই অর্থবছরে বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগের পরিমাণ শত কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলেও দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র।

এই অভিযোগের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নাম উঠে এসেছে। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন ও চূড়ান্ত সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় মূল্য নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, হাসপাতালের আধুনিকায়ন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটার ক্ষেত্রে বাজারমূল্য ও ক্রয়মূল্যের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ উচ্চমূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মূল্য দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ক্রয় নথি, আমদানি দলিল, এলসি, সরবরাহকারীর বিল, বাজারদর এবং অডিট প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের নথিপত্রের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই ছাড়া অভিযোগের আর্থিক পরিমাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ভুয়া বিল-ভাউচারের অভিযোগ

হাসপাতালের সংস্কার ও উন্নয়নকাজের নামেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কিছু কাজের বিপরীতে এমন প্রতিষ্ঠান বা ঠিকাদারের নামে বিল দেওয়া হয়েছে, যাদের অস্তিত্ব বা বাস্তব কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

হিসাব বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভিন্ন সময় ওপরের নির্দেশে কিছু বিল ও ভাউচার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হতো। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজারদরের সঙ্গে বিলের অঙ্কের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকলেও আপত্তি জানালে তা উপেক্ষা করা হতো।

তবে ওই কর্মকর্তার বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অডিট আপত্তি কি তদন্তের ভিত্তি?

অভিযোগের বিষয়ে ইবনে সিনা ট্রাস্টের প্রশাসন বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাম্প্রতিক কিছু বিল ও ভাউচার নিয়ে অডিট বিভাগের আপত্তির বিষয়টি তারা অবগত। তবে তিনি দাবি করেন, এটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো—অডিট আপত্তির পর কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কোন কোন বিল নিয়ে আপত্তি উঠেছে, কত টাকার আর্থিক অসংগতি শনাক্ত হয়েছে এবং এসব বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না। এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

অভিযোগের কেন্দ্রে ডা. তাহের

ইবনে সিনার আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্যে ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নাম উঠে এসেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, তার প্রভাবের কারণে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্তে সেই বলয়ের প্রভাব রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কী পরিমাণ লিখিত নথি বা প্রামাণ্য দলিল রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

গুরুতর এসব অভিযোগের বিষয়ে ডা. তাহেরের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাকে পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবস্থান কী?

বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিষয়টি খতিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।

দুদকের তদন্তের সুযোগ

অভিযোগে যদি সরকারি অর্থ, প্রতারণা, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জালিয়াতি বা অন্য কোনো দুর্নীতির উপাদান থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশনসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তদন্তের সুযোগ রয়েছে।

তবে সংবাদে প্রকাশিত অভিযোগমাত্রই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করে না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নথিপত্র, অডিট রিপোর্ট, ব্যাংক লেনদেন, ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র, সরবরাহকারীর তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

স্বচ্ছ তদন্তের দাবি

ইবনে সিনার মতো বড় একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি শুধু প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে রোগী, চিকিৎসক, কর্মী এবং বৃহত্তর জনস্বার্থও জড়িত।

অভিযোগের সত্যতা থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আবার অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা জরুরি।

এ কারণে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদন, গত দুই অর্থবছরের বড় কেনাকাটার নথি, যন্ত্রপাতি আমদানির কাগজপত্র, ঠিকাদারি বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার।

শত কোটি টাকার অভিযোগের প্রকৃত সত্য কোথায়—তা নির্ধারণের সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত।