সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (আইকিউএয়ার) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার ৭ অক্টোবর ঢাকা বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এদিন সকালের তথ্যমতে, ঢাকার বাতাসের মান সূচক বা একিউআই স্কোর ১৭৩ রেকর্ড করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘অস্বাস্থ্যকর’ ক্যাটাগরিতে পড়ে। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর ২১০ স্কোর নিয়ে তালিকার শীর্ষে এবং সিঙ্গাপুর ১৭৬ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। মূলত বাতাসের সাথে ভাসমান ধূলিকণা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কাজের ফলে নির্গত ক্ষতিকর ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতির কারণেই ঢাকার বাতাস ক্রমাগত বিষাক্ত হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে নগরবাসীর ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগব্যাধি হওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ঢাকার পরিবেশগত বিপর্যয়েরই একটি প্রতিচ্ছবি।
ঢাকার এই ভয়াবহ বায়ুদূষণের ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের জন্য বর্তমানে ঢাকার বাতাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুক্তভোগী নগরবাসীদের অভিযোগ, শহরের প্রধান সড়কগুলোর উন্নয়ন কাজ এবং অপরিকল্পিতভাবে উন্মুক্ত স্থানে নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখার কারণে ধুলোর পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এছাড়া নগরীর অধিকাংশ যানবাহনই মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন ব্যবহারের ফলে মাত্রাতিরিক্ত ধোঁয়া নিঃসরণ করছে, যা বাতাসের গুণমানকে প্রতিনিয়ত নিচের দিকে নামিয়ে দিচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে বাতাসে পিএম ২.৫ এর মতো মারাত্মক ক্ষতিকর কণার আধিক্য থাকায় দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের নিরাময় অযোগ্য শারীরিক জটিলতার কারণ হয়ে উঠছে।
বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায়ই নিয়ম রক্ষার জন্য কিছু অভিযান পরিচালনা করলেও, বাস্তবে ইটভাটার কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ বা নির্মাণ সাইটগুলোতে পানি ছিটানোর মতো সাধারণ নিয়মগুলোও কঠোরভাবে পালন করা হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার মোট বায়ুদূষণের একটি বড় অংশই আসে অপরিকল্পিত ইটভাটা এবং যানবাহনের ধোঁয়া থেকে। অথচ দূষণকারী এসব উৎস বন্ধে প্রশাসনিক নজরদারি অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, দূষণ রোধে শুধুমাত্র সতর্কবার্তা বা সূচক প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং দূষণকারী উৎসগুলোকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে কঠোর জরিমানা এবং বাতাসের মান উন্নয়নে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকার এই বায়ুদূষণ পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব হবে অপূরণীয়। অস্বাস্থ্যকর বাতাসের কারণে নগরীর বাসিন্দাদের কর্মদক্ষতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা খাতে ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিবেশগত এই বিপর্যয় রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নগর পরিকল্পনায় বায়ুমান উন্নয়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। অন্যথায়, ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় স্থায়ী আসন গেড়ে বসবে এবং নগরবাসীর জীবনের নিরাপত্তা চরম হুমকিতে পড়বে। বায়ুমান সূচকের এই ক্রমাগত অবনতি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে, যা অবিলম্বে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।