প্রবীণরা কি এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে মরবেন ?
অনলাইন ডেস্ক :
সম্প্রতি মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সি নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
তাতে দেখা যাচ্ছে, নূরজাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। লাশের ফুটেজেও নূরজাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, লাশ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন।
নূরজাহান বেগমের এক ছেলে যুগ্ম সচিব (এই ঘটনার পর তাকে ওএসডি করা হয়েছে) এক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
ঘটনাটি খুবই হৃদয়বিদারক। মা হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই অনেক যত্ন নিয়ে এই সন্তানদের বড় করেছিলেন। সেই সন্তানেরা উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। অথচ তাঁরা মায়ের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি, এটা বেদনাদায়ক।
এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে মানুষ এত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, নিজের মায়ের খোঁজও রাখতে চান না। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকজন প্রবীণের একাকী মৃত্যু আমাদের স্তম্ভিত করে। রাজধানীর পল্লবীর বাসা থেকে সেলিনা আফরোজা নামে এক নারীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারণা করা যায়, তিনি কয়েক দিন আগে মারা যান। জানা গেছে, তার স্বামী ও দুই সন্তান কানাডা প্রবাসী।
পারিবারিক কলহ থাকায় বাবার পৈতৃক ফ্ল্যাটে থাকতেন সেলিনা আফরোজা। ১২ বছর আগে তিনি কানাডা থেকে দেশে চলে আসেন এবং ওই বাসার একটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে একাই বসবাস করতেন। প্রবীণরা সমাজে কতটা অসহায়, এ ঘটনা দুটি নতুন করে আমাদের সামনে তুলে এনেছে। ঢাকায় এরকম দুটি ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি, দুঃখিত হয়েছি। কিন্তু গোটা দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। বছর চারেক আগে মাদারীপুরে এক গোরস্থানে পড়ে ছিলেন এই প্রবীণ নারী। তাঁকে এমন অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন তাঁর সন্তানরা। নারায়ণগঞ্জে অসুস্থ বৃদ্ধ মাকে রাস্তায় ফেলে যায় তাঁর সন্তানরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জে অসুস্থ বৃদ্ধ মাকে রাস্তায় রেখে গেছেন ছেলে। সিরাজগঞ্জে অসুস্থ বৃদ্ধ মাকে রাস্তায় ফেলে যান সন্তানেরা। হাজার খবরের ভিড়ে এসব এখন গা-সওয়া খবর। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা’ অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এখন দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দুই কোটির কিছু বেশি। এই প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ কী করছে?
আমাদের সমাজে, প্রবীণদের জন্য কিছু নেই। নামমাত্র মুষ্টিমেয় কিছু প্রবীণের জন্য ভাতার ব্যবস্থা ছাড়া, আমাদের দেশে প্রবীণরা কিছু পান না। তাঁদের জন্য গণপরিবহনে আলাদা আসন নেই, হাসপাতালে আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই, বিনোদনের ন্যূনতম সুযোগ নেই, পার্কে পৃথক জায়গা নেই। আছে শুধু অবহেলা, উপেক্ষা আর করুণা। প্রবীণরা যেন এই সমাজে পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের মতো।
এ প্রবীণরা সবাই একটি সময় পর্যন্ত নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। আজ দেশের সেই প্রবীণরা সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে তাদের প্রদত্ত সেবার বিপরীতে সামাজিক সম্মান আর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রত্যাশা করেন। প্রবীণদের জীবনকে স্বস্তিদায়ক ও শান্তিপূর্ণ রাখা কালের দাবি। সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যয় না করেও সরকার সদিচ্ছার মাধ্যমে তাদের জন্য শান্তিপূর্ণ জীবনের অনেকখানি নিশ্চিত করতে পারে। দেশের প্রবীণরা আশা করেন না শুরুতেই সরকার তাদের জন্য উন্নত বিশ্বের মতো সুযোগসুবিধা দিতে উদ্যোগী হবে। তবে এটা আশা করেন, সরকারিভাবে প্রবীণদের যে সামান্য সুযোগসুবিধা বিদ্যমান আছে সে ব্যবস্থাটুকু সহজতর করা হবে।
প্রবীণদের সব থেকে বেশি সমস্যা হচ্ছে তাদের শরীর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন কলকবজা দুর্বল হয়ে পড়ে। কিডনি-ফুসফুস-লিভার-হার্ট দুর্বল হয়ে যায়। দাঁত পড়ে যায়, চোখ ও কানের কার্যকারিতা কমতে থাকে। এতে করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি নানা শারীরিক সমস্যা দেখা যায়। সরকার চাইলেই সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রবীণদের জন্য পৃথক চিকিৎসা সেবা চালু করতে পারে। এতে কোনো বাড়তি খরচ হবে না। এভাবে সরকার প্রাথমিকভাবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে কোষাগারের অর্থ ব্যয় না করেও প্রবীণদের জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। দেশের প্রবীণ জনগণের জন্য একটা নীতিমালা প্রণয়ন করে তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে আসতে পারে সরকার। হাসপাতাল, গণপরিবহন, সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, পাসপোর্ট, বহির্গমন, কর ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি-টেলিফোনসহ অন্য বহু ক্ষেত্রে প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। প্রাথমিকভাবে এসব ক্ষেত্রে প্রবীণ ডেস্ক করা যেতে পারে যেখানে প্রবীণরা নিজেদের কাজে কিছুটা অগ্রাধিকার এবং নিরাপত্তা পাবেন। কিছু ক্ষেত্রে কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে, যে কোটার ভিত্তিতে তারা হাসপাতালে গেলে একটা সিট পাবেন, রেলের টিকিটটা নিশ্চিতভাবে পাবেন, বাসের টিকিট এবং সিট পাবেন, পাসপোর্ট জমা ও গ্রহণ করতে পারবেন, বিভিন্ন সেবার বিলটা সহজে জমা দিতে পারবেন, সেবা পাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে না। প্রাথমিকভাবে এসব সুবিধা প্রবীণদের প্রদান করার জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করা লাগবে না। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে সরকারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ২০-৩০ শতাংশ রেয়াতের ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত একাধিকবার প্রবীণ কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইনের খসড়া করা হলেও আজও আলোর মুখ দেখেনি। বিএনপি সরকার এ আইনটি পর্যালোচনা করে নতুন করে তা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রবীণদের জন্য সরকারিভাবে বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে মাত্র একটি। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিছু বৃদ্ধাশ্রম মিলিয়ে খুব অল্প কিছু প্রবীণের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশে বৃদ্ধ বয়সে সেবা দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাদানকারীও নেই। যেটা ভবিষ্যতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই, এখনই এ বিষয়ে নজর দেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন দেশের প্রবীণ বান্ধব নীতি ও কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করতে পারি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রবীণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। প্রবীণদের জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো দেশ সুইজারল্যান্ড। ইউরোপের এই দেশটিতে প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও তাদের যথাযথ পরিবেশের ব্যাপারে সরকারি বিভিন্ন নীতিমালা ও কর্মসূচি রয়েছে। এখানে ৬০ বছরের একজন মানুষ আরও ২৫ বছর বেঁচে থাকার প্রত্যাশা রাখেন। প্রবীণদের সামাজিক সংযুক্তি এবং নাগরিক স্বাধীনতার দিক থেকে সুইজারল্যান্ডের স্থান শীর্ষে। দেশটিতে নাগরিকদের বয়স ৬৫ পেরোলেই তিনি সব সরকারি সেবা বিনামূল্যে পান। গণপরিহনে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়। সবক্ষেত্রে প্রবীণদের দেওয়া হয় বিশেষ সুবিধা। সুইজারল্যান্ডে অসুস্থ প্রবীণদের জন্য বিশেষ কেয়ার গিভার দেওয়া হয় সরকারি খরচে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে তারা প্রবীণদের বাড়িতে গিয়ে সেবা প্রদান করেন। নরওয়েতেও প্রায় একই ধরনের সুবিধা রয়েছে। নরওয়েতে ওল্ড হোমগুলোতে আধুনিক সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে, যেন প্রবীণরা সেখানে আনন্দে সময় কাটাতে পারে।
জার্মানিতে প্রবীণদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। প্রবীণ ভাতার পাশাপাশি প্রবীণরা চাইলে অত্যাধুনিক ওল্ড হোমে থাকতে পারেন। সম্প্রতি জাপানে প্রবীণদের বিনোদনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। কানাডাতে প্রবীণদের ভাতার পাশাপাশি বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। প্রবীণদের একাকিত্ব দূর করতে কানাডাসহ বিভিন্ন উন্নত দেশ প্রবীণদের জন্য বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। এ ছাড়াও পার্কে প্রবীণদের জন্য রয়েছে আলাদা জায়গা। কিন্তু তারপরও উন্নত বিশ্বের প্রবীণদের মধ্যে একাকিত্ব বোধ বাড়ছে। জাপানে প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। সন্তান এবং নিকটাত্মীয়দের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবীণদের মধ্যে বাড়ছে মানসিক অবসাদ।
সেদিক থেকে বাংলাদেশের পারিবারিক বন্ধন এখনো অটুট। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসব বন্ধন ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে ছোট হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে প্রবীণেরা আরও বেশি একাকিত্বের যন্ত্রণা ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন।
উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম না থাকায় এ দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শারীরিক সমস্যায় প্রতিনিয়ত ভুগছেন।
পরিবার ও সমাজে তাঁরা অবহেলিত। পুষ্টিকর খাদ্য, চিকিৎসার সুবিধা, নাগরিক সুবিধা, পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদাসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতিনিয়ত তাঁরা মানসিক যন্ত্রণার শিকার হচ্ছেন। আমাদের এ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই জীবনধারণের মৌলিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত।
একটি প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনে সরকার তার আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। প্রথম দরকার, সরকারের সদিচ্ছা। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান বিএনপি সরকার অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কিছু উদ্ভাবনী এবং অনবদ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। প্রবীণদের নিয়েও কিছু করার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগ বদলে দিতে পারে প্রবীণদের জীবন। দূর করতে পারে তাদের অসহায়ত্ব। হাসপাতালগুলোতে প্রবীণ কাউন্টার, গণপরিবহনে বিশেষ আসন, ব্যাংকে প্রবীণদের অগ্রাধিকার সেবা, পার্ক, রেস্তোরাঁয় প্রবীণদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা যায় সহজেই। এতে প্রবীণরা উপলব্ধি করবেন, রাষ্ট্র, সরকার এবং সমাজ তাদের কথা ভাবে, তাদের সম্মান দেয়। সরকার যদি প্রবীণদের সম্মান জানায় তাহলে প্রবীণরা সম্মানিত হবেন পরিবার ও সমাজে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন