বাণিজ্য

জুলাইয়ে বিদেশি ঋণ ছাড়ের চেয়ে পরিশোধ আড়াই গুণ

জুলাইয়ে বিদেশি ঋণ ছাড়ের চেয়ে পরিশোধ আড়াই গুণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিদেশি ঋণের অর্থ ছাড়ের তুলনায় সুদ ও আসল বাবদ বাংলাদেশের পরিশোধের পরিমাণ প্রায় আড়াই গুণ বেশি হয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থা থেকে পাওয়া ঋণের অর্থ কমে যাওয়ার পাশাপাশি আগের নেওয়া বিপুল বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশের অনুকূলে মোট প্রায় ১৮ কোটি ১ লাখ ডলার ঋণের অর্থ ছাড় করেছে। বিপরীতে একই মাসে আগে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল বাবদ প্রায় ৪৫ কোটি ৩২ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।
অর্থাৎ, জুলাইয়ে যত অর্থ বিদেশি ঋণ হিসেবে পাওয়া গেছে, তার প্রায় আড়াই গুণ অর্থ ঋণদাতাদের ফেরত দিতে হয়েছে।
এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ঋণ ছাড়
গত অর্থবছরের একই সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে প্রায় ২০ কোটি ৮০ লাখ ডলার ঋণের অর্থ পেয়েছিল। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ঋণ ছাড় কমেছে প্রায় ২ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
অন্যদিকে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ কমেনি। গত বছরের জুলাইয়ে প্রায় ৪৪ কোটি ৬৬ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি ৩২ লাখ ডলারে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে মোট পরিশোধের মধ্যে প্রায় ৩৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার গেছে আসল বাবদ এবং প্রায় ১১ কোটি ১৫ লাখ ডলার গেছে সুদ পরিশোধে।
আগের ঋণের চাপ বাড়ছে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নিয়েছিল। এখন সেই ঋণের মেয়াদ অনুযায়ী সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
বিশেষ করে বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল বাবদ সরকার মোট প্রায় ৪৪৯ কোটি ৪১ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০৮ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় এডিবির
জুলাই মাসে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণের অর্থ ছাড় করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি দিয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৫৪ লাখ ডলার।
এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিশ্বব্যাংক, যারা প্রায় ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার ঋণের অর্থ ছাড় করেছে।
জাপান সরকারের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা দিয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এছাড়া ভারত থেকে এসেছে প্রায় ২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া গেছে আরও কিছু অর্থ।
তবে জুলাইয়ে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি), চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশের অনুকূলে কোনো ঋণের অর্থ ছাড় করেনি।
নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতিতেও বড় ধাক্কা
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জুলাইয়ে বাংলাদেশ নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে মাত্র প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
অথচ গত অর্থবছরের একই মাসে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ ডলার।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জুলাইয়ে বাংলাদেশের বড় তিন উন্নয়ন সহযোগী—বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা—কোনো নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। একইভাবে চীন, রাশিয়া ও এআইআইবির কাছ থেকেও নতুন কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
বিদেশি ঋণের অর্থ ছাড় কমে যাওয়া এবং পুরোনো ঋণের সুদ-আসল পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে সরকারের বৈদেশিক অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।