নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে বগুড়ার প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তবে ছিনতাইয়ের সময় সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেল এবং র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেল একই কি না, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। দুই বাইকের রং ও মডেলে দৃশ্যমান পার্থক্য থাকায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
রোববার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলায় র্যাব-২ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার মোশাররফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ছিনতাইয়ের ঘটনার মূল সন্দেহভাজন এবং অপর গ্রেপ্তার সেড্রিক তার সহযোগী।
শনিবার ভোরে চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে ঢাকা আসা বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। সংসদ ভবন এলাকার দক্ষিণ প্লাজার সামনে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি তার ব্যাগ টান দেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পরদিন রাজধানীর পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকা থেকে পনি ও সেড্রিককে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত বলে দাবি করা একটি ইয়ামাহা আর১৫ মডেলের মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানায় র্যাব।
তবে প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলটির সঙ্গে উদ্ধার করা বাইকের দৃশ্যমান পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। ভিডিওতে মোটরসাইকেলটিকে নীল রঙের দেখা গেলেও র্যাবের সরবরাহ করা উদ্ধার করা বাইকের ছবি রুপালি ও কালো রঙের।
বাইকপ্রেমী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের মতে, দুটি মোটরসাইকেলের মডেলেও পার্থক্য থাকতে পারে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটিকে ইয়ামাহা এবং অন্যটিকে সুজুকি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বলে মনে হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় দুইজনকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত বলে দাবি করা মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাবের ভাষ্য, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, এলাকার বড় ভাই হিসেবে পরিচিত পনি গাজী বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে যেতেন।
রাকিবের বরাত দিয়ে র্যাব জানায়, গত ২৬ আগস্ট থেকে ঘটনার দিন শনিবার বিকাল পর্যন্ত মোটরসাইকেলটি পনি গাজীর কাছে ছিল।
র্যাব আরও জানায়, নিহত শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের স্বামী আব্দুল মতিনকে উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি দেখানো হলে তিনি সেটিকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত বাইক বলে শনাক্ত করেছেন। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা চালকের শারীরিক গঠনের সঙ্গে পনি গাজীর মিল রয়েছে বলেও দাবি করেছে র্যাব।
স্থানীয় কয়েকজনকে ভিডিও দেখিয়ে সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। পাশাপাশি ঘটনার সময় পনি ও সেড্রিকের মোবাইল ফোনের অবস্থান সংশ্লিষ্ট এলাকার আশপাশে ছিল বলে দাবি করেছে র্যাব।
তবে সংবাদ সম্মেলনের সময় পনি গাজী নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, তাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন।
একপর্যায়ে তিনি নিজের মোটরসাইকেলের রঙের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দাবি করেন, তার বাইক রুপালি ও কালো রঙের হলেও সিসিটিভি ফুটেজে দেখা বাইকটি নীল রঙের। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
তবে নিহত শিক্ষিকার স্বামী আব্দুল মতিন পরে বলেন, ঘটনার সময় স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মোটরসাইকেলের রং বা মডেল তিনি ভালোভাবে খেয়াল করতে পারেননি।
তিনি বলেন, ঘটনার সময় বাইকটির রং কী ছিল তা নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারছেন না। তবে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
র্যাব-২ অধিনায়ক নয়মুল হাসান বলেন, মামলায় এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ নেই। এ কারণে পনি ও সেড্রিককে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, তদন্তের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে আরও তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে এবং বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে রাতের আলো বা ভিডিও ধারণের কারণে মোটরসাইকেলের রঙে বড় ধরনের পরিবর্তন হতে পারে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দীপ্তি দত্ত সিসিটিভি ভিডিও ও উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের ছবি পর্যবেক্ষণ করে বলেন, ভিডিওতে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা, বিজ্ঞাপন ও মানুষের পোশাকের রঙে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আলোর প্রতিফলন বা গতির কারণে মোটরসাইকেলের রঙে এত বড় ধরনের পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ফলে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা নীল রঙের মোটরসাইকেল এবং র্যাবের উদ্ধার করা রুপালি-কালো রঙের বাইকটি একই কি না, তা নিয়ে তদন্তে আরও স্পষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন বলে প্রশ্ন উঠেছে।